মোঃ নুর ইসলাম মৃধা
এম এ, এলএল বি, এল এইচ এম পি
মানবজীবন এক অবিরাম পরীক্ষা। পৃথিবীর জীবনে মানুষকে নানারকম প্রলোভন, পাপাচার ও অন্যায়ের সম্মুখীন হতে হয়। মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা দিয়েছেন এবং তাঁর কিতাব ও নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে সরল পথ প্রদর্শন করেছেন। তবুও মানুষ অনেক সময় পরিবেশ, প্রলোভন ও খারাপ সঙ্গের কারণে পাপের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বখ্যাত সুফি সাধক মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমী (রহঃ) বলেছেনঃ
“পাপ থেকে দূরে থাকার সব চেয়ে ভালো উপায় হল সেই সব বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো যারা খোদার দিকে মুখ ফিরিয়ে আছে।”
এই উক্তি মানুষের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।
সঙ্গের প্রভাব ও ইসলামের শিক্ষাঃ
মানুষের চরিত্র গঠনে সঙ্গ ও পরিবেশের ভূমিকা অপরিসীম। একজন মানুষ যার সাথে বেশি সময় কাটায়, ধীরে ধীরে তার প্রভাবেই তার চরিত্র ও অভ্যাস গড়ে ওঠে। ইসলামে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ বলেনঃ
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গ গ্রহণ কর।”
(সূরা আত-তাওবা, আয়াত ১১৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ
“মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকের উচিত কাকে বন্ধু বানাচ্ছে, তা লক্ষ্য করা।”
(আবু দাউদ, তিরমিজি)
এ থেকে বোঝা যায়, নেক সঙ্গ কেবল সামাজিক বন্ধুত্ব নয় বরং ঈমানের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য বিষয়।
নেক সঙ্গ ও চরিত্র গঠনঃ
মানুষ স্বভাবতই অনুকরণপ্রবণ। নেক বন্ধুদের সাথে সময় কাটালে তার হৃদয়ে ইবাদতের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়, পরকালের ভয় জাগে এবং আল্লাহভীতি বৃদ্ধি পায়। অপরদিকে, পাপাচারীদের সঙ্গ মানুষকে ধীরে ধীরে গোনাহর দিকে টেনে নিয়ে যায়।
হাদিসে নেক সঙ্গের উপমা এসেছে এভাবে—
“সৎ সঙ্গীর উপমা হলো কস্তুরী বিক্রেতার মতো। তুমি তার কাছ থেকে সুগন্ধ কিনতে পারো, অথবা তার সুগন্ধি থেকে অন্তত সুন্দর ঘ্রাণ উপভোগ করবে। আর খারাপ সঙ্গীর উপমা হলো লৌহকারের ধোঁয়ার মতো। হয়ত সে তোমার পোশাক পুড়িয়ে দেবে, অথবা তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে।”
(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
সুফি সাধকদের দৃষ্টিভঙ্গিঃ
সুফি সাধকরা আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য নেক সঙ্গকে অপরিহার্য বলেছেন।
মাওলানা রুমী (রহঃ) তাঁর মসনবী গ্রন্থে একাধিক স্থানে আল্লাহমুখী বন্ধুদের সান্নিধ্য লাভের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, নেককার সঙ্গ আত্মাকে জাগ্রত করে এবং আল্লাহর দিকে ধাবিত করে।
ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইহইয়াউ উলুমুদ্দীন-এ লিখেছেনঃ
“যে সঙ্গ তোমাকে আল্লাহর দিকে টেনে নেয়, সেটিই প্রকৃত সঙ্গ; আর যে সঙ্গ আল্লাহর স্মৃতি ভুলিয়ে দেয়, সেটিই ধ্বংসের কারণ।”
বাস্তব জীবনে প্রয়োগঃ
১. নেককার, সত্যবাদী ও নামাজি বন্ধু নির্বাচন করা।
২. মসজিদ, ইসলামী মাহফিল ও দরসে কুরআনের পরিবেশে সময় কাটানো।
৩. অশ্লীল আড্ডা ও গোনাহর পরিবেশ থেকে দূরে থাকা।
৪. বন্ধুদের সাথে একত্রে ইবাদত, দান-সদকা ও কল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়া।
মাওলানা রুমী (রহঃ)-এর বাণী যুগোপযোগী ও চিরসত্য। মানুষ তার সঙ্গী দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই পাপ থেকে দূরে থাকার সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো নেক বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো, যারা খোদার দিকে মুখ ফিরিয়ে আছে। নেক সঙ্গ মানুষকে আল্লাহর নৈকট্যে নিয়ে যায়, পাপ থেকে রক্ষা করে এবং আখিরাতের মুক্তির পথে পরিচালিত করে।
উদ্ধৃতি-সূত্রঃ
আল-কুরআন: সূরা আত-তাওবা, আয়াত ১১৯।
হাদিস: আবু দাউদ, তিরমিজি; সহিহ বুখারি ও মুসলিম (সৎ ও অসৎ সঙ্গীর উপমা)।
ইমাম গাজ্জালী (রহঃ), ইহইয়াউ উলুমুদ্দীন।
মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমী (রহঃ), মসনবী।