• রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৭ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

মুক্ত হোক অসহায় সাংবাদিকতা: তথ্য হোক জনতার, তাড়িত হোক অপকৃষ্ট কজন

Reporter Name / ৪৩৫ Time View
Update : শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

 

শেখ সাইফুল ইসলাম কবির

“তথ্যই শক্তি”—এই বাক্যটি আজ আর কেবল কোনো নীতিবাক্য নয়, এটি বর্তমান সময়ের নির্মম বাস্তবতা। একটি দেশের নাগরিক সচেতন না হলে, রাষ্ট্র কখনোই সঠিক পথে এগোতে পারে না। আর এই সচেতনতা গড়ে তোলে তথ্য, সংবাদ, এবং সর্বোপরি সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যা সমাজের দর্পণ হয়ে কাজ করে। তারা শুধু তথ্য পরিবেশন করে না; তারা প্রশ্ন তোলে, অন্যায় উন্মোচন করে, সত্যকে সামনে আনে। কিন্তু এই মহান পেশাটি আজ নানাবিধ চাপে, হুমকিতে এবং নিয়ন্ত্রণে পড়েছে। বলা যায়, সাংবাদিকতা আজ অনেকক্ষেত্রেই অসহায়। আর তাই সময় এসেছে—সাংবাদিকতার মুক্তির কথা বলার, তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করার, এবং অপশক্তির বিরুদ্ধে সক্রিয় হবার।

 

অসহায় সাংবাদিকতা: সংকট কোথায়?

আজকের বাস্তবতায় সাংবাদিকরা অনেকটাই কোণঠাসা। নানা সময়ে দেখা গেছে, যারা সত্য প্রকাশ করেন, তারা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন। কারো বিরুদ্ধে মামলা, কারো চাকরিচ্যুতি, আবার কেউ হয়তো শারীরিক আক্রমণের মুখে পড়েন। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সাংবাদিক নিখোঁজ হয়ে গেছেন বা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন।

এই চিত্রটি শুধু একটি দেশের নয়, বরং বিশ্বব্যাপী। তবে উন্নয়নশীল বা গণতান্ত্রিক অবকাঠামো দুর্বল যেসব দেশে, সেখানে এই অসহায়ত্ব আরও প্রকট।

কেন এমন হচ্ছে? কারণ সাংবাদিকতা আজ রাজনৈতিক স্বার্থ, অর্থনৈতিক পুঁজির নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতার মাঝে পড়ে গেছে। গণমাধ্যমের মালিকানা বড় কর্পোরেট বা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে চলে যাওয়ায়, সংবাদ পরিবেশনের স্বাধীনতা প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সাংবাদিকরা হয়ে পড়েন ‘নির্দেশিত কলমধারী’। সত্য প্রকাশের বদলে তারা বাধ্য হন ‘নির্বাচিত সত্য’ পরিবেশন করতে।

তথ্য যদি গোপন থাকে, অন্ধকারে ডুবে যায় সমাজ

একটি সমাজের মেরুদণ্ড হলো তথ্যের প্রবাহ। জনগণ যদি না জানে, তাহলে তারা প্রশ্ন করতে পারে না। আর যদি প্রশ্ন না ওঠে, তাহলে শাসকদের জবাবদিহির প্রয়োজন পড়ে না। তখনই জন্ম নেয় একনায়কতন্ত্র, বাড়ে দুর্নীতি, ন্যায়বিচার বিলীন হয়ে যায়।

আমরা দেখতে পাই, কোথাও কোনো দুর্নীতির ঘটনা ঘটলে সেটি জনসমক্ষে আনা হয় সাংবাদিকদের হাত ধরেই। তারা অনুসন্ধান করেন, দলিল-প্রমাণ হাজির করেন, জনমত গড়ে তোলেন। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটির জন্য তারা পাচ্ছেন না রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা, বরং পেতে হচ্ছে অবহেলা ও নিপীড়ন।

তথ্য হোক জনতার অধিকার—এটা যেন কেবল কাগুজে স্লোগান না থাকে, বরং বাস্তব জীবনে কার্যকর হয়। তথ্যের অবাধ প্রবাহ রুখে দিয়ে কিছু শ্রেণি নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করলেও, গোটা সমাজ হয়ে পড়ে বিভ্রান্ত ও নিস্ক্রিয়।

 

তাড়িত হোক অপকৃষ্ট কজন, যারা সত্যকে ভয় পায়

একটি প্রশ্ন আমাদের করতে হবে: কে বা কারা সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে ভয় পায়?
উত্তরটা খুব পরিষ্কার—যারা দুর্নীতিপরায়ণ, যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা ভোগ করে, যারা অপশাসনের মাধ্যমে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়—এই কজনই চায় না যে সাংবাদিকতা মুক্ত থাকুক।

তারা চায় না সত্য সামনে আসুক, তারা চায় না কেউ প্রশ্ন করুক। তারা চায় সবাই মাথা নিচু করে চলুক।
এই অপকৃষ্ট কজনের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম করতে হবে। এটি কেবল সাংবাদিকদের নয়, আমাদের সবার সংগ্রাম। সমাজের প্রতিটি সচেতন মানুষকে এই অন্ধকার দূর করতে এগিয়ে আসতে হবে।

 

যুক্ত হোক তথ্য জনে: সচেতন নাগরিকই প্রকৃত শক্তি

জনগণ যত বেশি তথ্য জানবে, তত বেশি সচেতন হবে।
তথ্য জানতে পারলে তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অবগত হবে, অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করতে পারবে, ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারবে।

আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে অনেকেই খবর ছড়াতে পারেন, কিন্তু এর মানে এই নয় যে পেশাদার সাংবাদিকতা অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। বরং এখন আরও বেশি দরকার নির্ভরযোগ্য, যাচাইকৃত, নিরপেক্ষ তথ্য।

সাংবাদিকতার মূল কাজ হলো তথ্য যাচাই করা, প্রেক্ষাপট বোঝানো, এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা। সেজন্য দরকার তাদের স্বাধীনতা এবং জনসমর্থন।

 

এখনই সময়: আর নয় অপেক্ষা, আর নয় নীরবতা

অসহায় সাংবাদিকতা যে শুধু সাংবাদিকদের সমস্যা নয়, তা আজ পরিষ্কার। এটি গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সমাজবোধের সমস্যা।

যদি আমরা এই অবস্থার পরিবর্তন চাই, তাহলে এখনই সময়—

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার,

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার,

তথ্য জানার অধিকারকে সাংবিধানিক ও বাস্তবিকভাবে কার্যকর করার।

একটি সমাজ যখন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করে, তখন আসলে সে নিজের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে।

তাই এই মুহূর্তেই আমাদের উচ্চারণ করতে হবে—
মুক্ত হোক অসহায় সাংবাদিকতা,
যুক্ত হোক তথ্য জনে,
তাড়িত হোক অপকৃষ্ট কজনে।
এখনই সময়!

উপসংহার

সাংবাদিকতা কখনোই কেবল একটি পেশা নয়—এটি দায়িত্ব, এটি নৈতিকতা, এটি সাহসের প্রতীক। সাংবাদিকদের যদি আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিই, তবে একসময় সমাজ নিজেই তার পথ হারাবে।

তাই সময় এসেছে, যখন রাষ্ট্র, জনগণ, শিক্ষিত সমাজ ও তরুণ প্রজন্ম—সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে সত্যের পক্ষে। সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াতে হবে, তাদের কথা শুনতে হবে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

তথ্যের ওপরে যে কোনো নিষেধাজ্ঞা, সাংবাদিকতার ওপর যে কোনো চাপ, তা কেবল সাংবাদিকদের ক্ষতি করে না—তা পুরো জাতিকে পিছিয়ে দেয়।

তাই আজ, এই মুহূর্তে, আমরা সবাই যেন বলতে পারি—
সত্যের পথে, সাহসের পাশে, সাংবাদিকতার পাশে আমরা আছি।
মুক্ত হোক অসহায় সাংবাদিকতা!

শেখ সাইফুল ইসলাম কবির চেয়ারম্যান জাতীয় মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটি ঢাকা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd