মোঃ রায়হান পারভেজ নয়ন
ডিমলা নিলফামারী প্রতিনিধি:
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় বেপরোয়া গতির বালুবোঝাই ট্রলির ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছেন জামায়াত নেতা, শিক্ষাবিদ ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব মাওলানা রফিকুল ইসলাম (৬০)। রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার শুটিবাড়ি বাজার সংলগ্ন গয়াবাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশের রাস্তায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত মাওলানা রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি খালিশাচাপানী ইউনিয়ন জামায়াতের সাবেক আমির, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের ডিমলা উপজেলা সেক্রেটারি ও ছাতনাই বালাপাড়া দাখিল মাদ্রাসার সহকারী সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি তিনি ডিমলার তিতপাড়া বড় জুমা জামে মসজিদের খতিব হিসেবেও এলাকায় সুপরিচিত ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার সকালে তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে উত্তোলিত বালুবোঝাই কয়েকটি ট্রলি শুটিবাড়ি হয়ে ডালিয়ার দিকে যাচ্ছিল। ওই সময় খালিশাচাপানীর নিজ বাড়ি থেকে মোটরসাইকেলযোগে মাদ্রাসায় যাচ্ছিলেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম। পথে দ্রুতগামী একটি ট্রলি তার মোটরসাইকেলে সজোরে ধাক্কা দিলে তিনি ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন।
তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। খবরটি মুহূর্তেই এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে শোকের আবহ নেমে আসে।
দুর্ঘটনার পরপরই বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ঘণ্টাব্যাপী শুটিবাড়ি-ডালিয়া সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। বিক্ষোভকারীরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন করে আসছে একটি প্রভাবশালী চক্র। এসব বালুবোঝাই ট্রলি বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে, যার ফলে একদিকে সড়ক ভেঙে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে প্রায়ই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে।
তারা এ সময় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধের দাবি জানান। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কার করার দাবি জানানো হয়। বিক্ষোভকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দাবি পূরণ না হলে সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) থেকে ডিমলা-ডালিয়া সড়কসহ শুটিবাড়ি অঞ্চলের সব সড়ক অবরোধ করে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।
রাজনৈতিক সহকর্মীদের প্রতিক্রিয়া
উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান বলেন,
আমরা গভীরভাবে শোকাহত। একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা ও আলেমকে হারালাম। এ ঘটনায় শুধু আমাদের সংগঠনই নয়, পুরো এলাকা শোকে স্তব্ধ। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের কঠোর শাস্তি দাবি করছি।
একই সঙ্গে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন ও স্থানীয় মাদ্রাসা শিক্ষকরাও তার মৃত্যুকে অপূরণীয় ক্ষতি বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ডিমলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফজলে এলাহী বলেন,
ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং অবৈধ ট্রলি মালিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ডিমলার তেলিরবাজার ও আশপাশ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী মহল অবৈধভাবে তিস্তা নদী থেকে বালু ও পাথর উত্তোলন করছে। প্রতিদিন শত শত ট্রলি এসব বালু বহন করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছে। ট্রলিগুলোতে ব্রেকের ব্যবস্থা নেই, চালকেরা অদক্ষ এবং অতিরিক্ত গতিতে চালায়। এতে একদিকে প্রাণহানি ঘটছে, অন্যদিকে সড়কগুলোর বেহাল দশা সৃষ্টি হয়েছে।
মাওলানা রফিকুল ইসলামের অকাল মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তার ছাত্র-শিক্ষক, রাজনৈতিক সহকর্মী, মসজিদের মুসল্লি এবং এলাকাবাসী চোখের জল ফেলে স্মরণ করছেন তাকে। স্থানীয়রা জানান, তিনি ছিলেন একজন সহজ-সরল, পরোপকারী ও সবার প্রিয় মানুষ। তার মৃত্যুতে ডিমলার সামাজিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।
এলাকাবাসী দ্রুত অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। একইসাথে নিহত মাওলানা রফিকুল ইসলামের পরিবারকে ন্যায়বিচার প্রদানের জন্যও সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
এ দিকে রাত ৮.৩০ মিনিটে মওলানা মোঃ রফিকুল ইসলামের জানাযা অনিষ্টত হয়। উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের জেলা আমির অধ্যক্ষ আব্দুস সাত্তার সহ জেলা ও উপজেলা আমির সহ জানাযায় হাজার হাজার নিজ দলের নেতাকর্মী ছাড়া অন্য দলের অসংখ্য নেতাকর্মী ও শিক্ষক এলাকা বাসি সহ অনেকই উপস্থিত ছিলেন।