লেখকঃ মানিক পাল
চিত্রাঙ্গদা ধনুক ধরেছিল, স্বয়ং রাজ্য শাসন করেছিল,
‘কবে বিয়ে’– কেউ জিজ্ঞেস করেনি তাকে।
আমার ভগিনী ত্রিশের চৌকাঠ পেরোলে
প্রতিবেশিনীরা পঞ্জিকা খোলে,
কুশীলবের মতো আওড়ায়–
‘আর কতকাল?’
গার্গী ব্রহ্মসভায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছিল,
অবিবাহিতা, অকুতোভয়, ঋষিদের চোখে চোখ রেখে।
আজ গার্গীরা প্রশ্ন তুললে
উত্তর মেলে না, মেলে উপাধি–
‘উদ্ধত’, ‘অহংকারী’, ‘নিশ্চয় কোনো গলদ’।
তোমরা কানাঘুষোয় সিদ্ধহস্ত, কোলাহলে পারঙ্গম,
‘মেয়েটার বয়স বয়ে যায়’ বলে শোকসভা বসাও।
অথচ ‘সুপাত্র কোথায়’ শুধালে
নিমেষে নিরুত্তর– ‘আমরা কী জানি, বাপু!’
উপদেশে দাতাকর্ণ, দায়িত্বে দীনদরিদ্র।
দ্রৌপদীর পঞ্চস্বামী সভামাঝে স্বীকৃত,
কুন্তীর কুমারী-মাতৃত্ব মহাকাব্যে বন্দিত।
আমি শুধু নিঃসঙ্গতাকে বরমাল্য দিতে চাই–
তাতেই তোমাদের শাস্ত্রের শিরা কাঁপে?
কোন স্মৃতিতে লেখা আছে নারী মানেই পত্নী?
অহল্যাকে শিলা করেছিল ইন্দ্রের কামনা,
আমাকে শিলা করো ‘অবিবাহিতা’ এই অপবাদে।
আমি অহল্যা নই, প্রতীক্ষারতও নই।
শাপমোচনের জন্য অবতারের পাদস্পর্শ লাগে না,
আমার নিজের পদক্ষেপই যথেষ্ট প্রলয়।
শোনো হে সমাজপতি, শোনো পিতৃতন্ত্রের দ্বাররক্ষী:
এই জরায়ু আমার সার্বভৌম রাষ্ট্র,
এই পঞ্জিকা আমার নিজস্ব সংবিধান।
পরিণয় হবে কি হবে না,
মাতৃত্ব আসবে কি আসবে না,
সঙ্গ নেব কি বৈরাগ্যই হবে ব্রত–
এই স্বাধীনতাপত্রে তোমাদের অনুস্বাক্ষর নিষ্প্রয়োজন।
তোমাদের বয়স-গণিত, তোমাদের মিথ্যা উদ্বেগ,
তোমাদের ‘ভালোর জন্য বলছি’ নামক শৃঙ্খল–
সব প্রত্যাহার করো।
আমার জীবন কোনো গণসভার প্রস্তাব নয়
যে সংখ্যাগুরুর হস্তধ্বনিতে নির্ধারিত হবে।
আমি উচ্চারণ করি– না।
তোমাদের বিবাহ-বিপণিতে না।
তোমাদের বয়স-আতঙ্কে না।
তোমাদের ওই লোকলজ্জার জেল আমার জন্য না।
আমার অস্তিত্ব, আমার আদেশ।
আমার শরীর, আমার সিদ্ধান্ত।
ফুলস্টপ।