স্টাফ রিপোর্টার, জগন্নাথপুর
সমাজের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে স্বপ্নজয়ী পাঠশালা—একটি মানবিক ও আলোকিত উদ্যোগের প্রতীক। নীরব অথচ দৃঢ় এই আলোর অভিযাত্রাকে আরও গতিশীল করতে এগিয়ে এলেন প্রবাসে থাকা এক তরুণ সমাজসেবক, যার হৃদয়ের গভীরে এখনো অটুট রয়েছে দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম টান।
জগন্নাথপুর পৌর এলাকার স্বপ্নজয়ী পাঠশালার শিক্ষার্থীদের জন্য ৪ মে (সোমবার) দুপুরে ইকড়ছই গ্রামের কৃতি সন্তান, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী লিকন ভূঁইয়া-এর সৌজন্যে বিদ্যালয়টিতে দুটি বৈদ্যুতিক ফ্যান উপহার প্রদান করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে সামান্য এই উপহারই যেন হয়ে উঠেছে শিশুদের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস—দুর্বহ গরমের মাঝে তাদের পাঠদানের পরিবেশে এনে দিয়েছে স্বস্তি, প্রাণচাঞ্চল্য ও নতুন উদ্দীপনা।
গ্রামীণ বাস্তবতায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য গড়ে ওঠা পাঠশালাগুলোর ক্ষেত্রে মৌলিক চাহিদা পূরণই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ। ঠিক সেই বাস্তবতা থেকেই লিকন ভূঁইয়ার এই উদ্যোগ কেবল একটি উপহার নয়—এটি মানবিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা সমাজের অন্যদের জন্যও অনুকরণীয় হয়ে উঠতে পারে।
পাঠশালার পক্ষ থেকে জানানো হয় গভীর কৃতজ্ঞতা ও আন্তরিক ধন্যবাদ। সংশ্লিষ্টরা বলেন,
“শিক্ষাক্ষেত্রে এ ধরনের সহযোগিতা আমাদের পথচলাকে আরও শক্তিশালী করে। সমাজের বিত্তবান ও প্রবাসীরা যদি এভাবে এগিয়ে আসেন, তাহলে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথপুর ব্রিটিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউটের পরিচালক মুত্তাকিন বিল্লাহসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। তাদের উপস্থিতি আয়োজনটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রাণবন্ত করে তোলে।
দেশের ৯ জেলায় ১০টি ‘স্বপ্নজয়ী পাঠশালা’
অসহায় শিশুদের শিক্ষায় মানবিক দৃষ্টান্ত
দেশের সুবিধাবঞ্চিত, দরিদ্র ও শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে এক ব্যতিক্রমধর্মী মানবিক উদ্যোগ হিসেবে দেশের ৯টি জেলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১০টি ‘স্বপ্নজয়ী পাঠশালা’। এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন সাগরিকা নাসরীন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব—যিনি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থেকে একটি সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করেছেন।
তার উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই শিক্ষা কার্যক্রম বর্তমানে গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, বাগেরহাট, পঞ্চগড়, নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, রাজবাড়ী, টাঙ্গাইল এবং সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলায় রয়েছে দুটি পাঠশালা, যা স্থানীয়ভাবে ইতোমধ্যেই আশার আলো হয়ে উঠেছে।
শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আলোর দিশা
সাগরিকা নাসরীন বলেন,
“অসহায় ও দরিদ্র শিশুদের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকেই এই উদ্যোগ। অনেক শিশু শুধুমাত্র সুযোগের অভাবে পিছিয়ে পড়ে—তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”
তিনি আরও জানান, পাঠশালাগুলোতে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, বরং শিশুদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—যা ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পরিদর্শনে সাংবাদিক ও সমাজসেবীরা
জগন্নাথপুরের স্বপ্নজয়ী পাঠশালা পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিক ও সমাজসেবীরা শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ এবং শিক্ষকদের নিবেদিত ভূমিকা প্রত্যক্ষ করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম-এর মহাসচিব আহমেদ হোসাইন ছানুসহ স্থানীয় বিশিষ্টজনরা। পাঠশালার শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি তুলে ধরলে উপস্থিত অতিথিরা সন্তোষ প্রকাশ করেন।
বিনামূল্যে শিক্ষা ও মানবিক সহায়তা
স্বপ্নজয়ী পাঠশালাগুলোতে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাঠদান, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ এবং বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। অনেক শিশুই এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে—যা তাদের জীবনের গতিপথই বদলে দিচ্ছে।
স্থানীয় অভিভাবকদের মতে, এই পাঠশালাগুলো শুধু শিক্ষা নয়, বরং শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, স্বপ্ন দেখার সাহস এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করছে।
দেশজুড়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা
প্রতিষ্ঠাতা সাগরিকা নাসরীন জানান, ভবিষ্যতে দেশের আরও প্রত্যন্ত ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে এই কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তার বিশ্বাস—শিক্ষাই দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং সামাজিক বৈষম্য কমানোর সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
মানবিক উদ্যোগে বদলে যাচ্ছে বাস্তবতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ের এমন মানবিক কর্মকাণ্ডই পারে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জীবনে টেকসই পরিবর্তন আনতে। স্বপ্নজয়ী পাঠশালা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে—সদিচ্ছা, দায়বদ্ধতা ও মানবিকতা থাকলে সীমিত সম্পদ দিয়েও বড় পরিবর্তন সম্ভব।
শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে স্বপ্নজয়ী পাঠশালা আজ হয়ে উঠছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার এক নীরব আন্দোলনের নাম—যেখানে প্রতিটি শিশুর চোখে জ্বলছে সম্ভাবনার দীপ্তি, আর প্রতিটি স্বপ্ন হয়ে উঠছে একদিন বাস্তবতার দৃঢ় ভিত্তি।