পলাশ মন্ডল আকাশ
স্বাধীনতার পর থেকে কোটি মানুষের রক্ত আর তিল তিল পরিশ্রমে গড়া আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ আজ এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা কি আসলেই স্বাধীন, নাকি কোনো অদৃশ্য সুতোর টানে আমাদের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে? ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে আমেরিকার সাথে হওয়া একের পর এক ‘অসম চুক্তি’ সেই প্রশ্নকেই আজ বড় করে তুলেছে।
তড়িঘড়ি চুক্তি ও যৌক্তিক সংশয়:
সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটেছে ২০২৬ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি। নির্বাচনের মাত্র ৩ দিন আগে, যখন একটি সরকারের বিদায় নেওয়ার কথা, তখন তড়িঘড়ি করে আমেরিকার সাথে ‘Reciprocal Trade Agreement’ সই করা হয়েছে। একটি অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তে এমন দীর্ঘমেয়াদী এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা নৈতিক বা আইনসম্মত, তা আজ বড় প্রশ্ন। ১৯ শতাংশ শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে মার্কিন মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য ও কেমিক্যাল আমদানির যে পথ প্রশস্ত করা হয়েছে, তা আমাদের দেশীয় উদীয়মান খামারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জ্বালানি খাতের মরণ-ফাঁদ:
ইউনূস সরকারের আমলে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সাথে ১৫ বছরের জন্য প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের (১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি) এলএনজি আমদানির যে চুক্তি হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতির জন্য এক ‘মরণ-ফাঁদ’। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখন তলানিতে, তখন এই বিশাল ডলারের ঋণের কিস্তি শোধ করতে গিয়ে বর্তমান নির্বাচিত সরকার দিশাহারা।
কৌশলগত সম্পদ হস্তান্তর:
দেশের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়া এবং অলাভজনক অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও ৫৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪টি নতুন বোয়িং বিমান কেনার অলিখিত সমঝোতা মূলত মার্কিন কর্পোরেট স্বার্থই রক্ষা করেছে। এর ফলে আমাদের আকাশপথ ও নৌপথের নিয়ন্ত্রণ পরোক্ষভাবে অন্যদের হাতে চলে গেছে।
শিল্প ও কৃষিতে আঘাত:
পোশাক শিল্পে শুল্ক সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে মার্কিন তুলা আমদানির কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আমাদের প্রধান রপ্তানি খাতটি এখন কাঁচামালের জন্য সম্পূর্ণভাবে আমেরিকার মর্জির ওপর নির্ভরশীল।
উপসংহার:
এই ১৮ মাসের শাসনামলে দেশপ্রেমের বুলির আড়ালে দেশটাকে মূলত একটি নির্দিষ্ট পরাশক্তির কাছে ঋণের দায়ে জিম্মি করা হয়েছে। বর্তমান সরকার ও জনগণের কাঁধে এখন সেই পাহাড় সমান ঋণের বোঝা। সত্য এটাই যে, এই ভুল ও স্বার্থবিরোধী চুক্তির খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে—দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর ক্রমবর্ধমান করের মাধ্যমে। আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এই চুক্তিগুলো অনতিবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।