লেখক: শিরিনা আক্তার
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদপত্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য সংবাদপত্রকে বলা হয় তার প্রহরী। সংবাদপত্র সবসময় নিপীড়িত মানুষের কথা বলে, সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার থাকে। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জবাবদিহিতা, আর এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এজন্য সংবাদপত্রকে গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক বলা হয়।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনে সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম। পৃথিবীর এক প্রান্তে যুদ্ধ, দুর্যোগ বা অন্যায় সংঘটিত হলে সংবাদপত্র সেই খবর পৌঁছে দেয় বিশ্ববাসীর কাছে। ফলে মানুষ সচেতন হয়, মানবতা জাগ্রত হয়। জনমত গঠনে সংবাদপত্রের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। বলা হয়, “The newspaper is a daily necessary article”—অর্থাৎ সংবাদপত্র দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপাদান। আবার মার্কিন রাষ্ট্রনায়ক টমাস জেফারসন বলেছিলেন, “যদি সরকারবিহীন সংবাদপত্র আর সংবাদপত্রবিহীন সরকার—এর মধ্যে একটি বেছে নিতে হয়, আমি সংবাদপত্রকেই বেছে নেব।” এ উক্তিই সংবাদপত্রের শক্তি ও প্রয়োজনীয়তার প্রমাণ বহন করে।
উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলো—যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা জাপান—সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। সেখানে গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে সরকারের সমালোচনা করতে পারে, দুর্নীতি প্রকাশ করতে পারে এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে শাসকগোষ্ঠী সবসময় জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য হয়। এ কারণেই উন্নত দেশগুলোতে গণতন্ত্র শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে।
বর্তমান বিশ্বে সংবাদপত্র শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ নয়; ইন্টারনেট, অনলাইন সংস্করণ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংবাদ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে। এতে জনগণ দ্রুত তথ্য পাচ্ছে এবং সচেতনতা বাড়ছে। তবে হলুদ সাংবাদিকতা, বিভ্রান্তিকর খবর ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হতে পারে। তাই সংবাদপত্রকে দায়িত্বশীল ও সত্যনিষ্ঠ হতে হবে।
আমাদের দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দিতে হবে, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকার, বিরোধী দল ও সকল রাজনৈতিক শক্তিকে সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা, নৈতিকতা ও গণসচেতনতা বৃদ্ধি করাও জরুরি। জনগণ যদি সচেতন ও দায়িত্ববান না হয়, তবে গণতন্ত্র কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
পত্রিকা অফিস ধ্বংস করা বা সংবাদপত্রের কণ্ঠ রোধ করা মানে জাতির চোখ অন্ধ করে দেওয়া। সংবাদপত্র ধ্বংস হলে সত্য চাপা পড়ে যায়, অন্যায় শক্তি বেড়ে ওঠে এবং জাতির ভাগ্যাকাশ অন্ধকারে ঢেকে যায়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে, স্বৈরতন্ত্র মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তখন জনগণ সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়, বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়।
সংবাদপত্র মানুষের কথা বলে, সমাজের আয়না হিসেবে কাজ করে এবং শাসককে সতর্ক রাখে। তাই গণতন্ত্র রক্ষায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অপরিহার্য। একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমই পারে জাতিকে আলোকিত পথে এগিয়ে নিতে। গণতন্ত্রের সুরক্ষা ও উন্নয়নের জন্য সংবাদপত্রকে মর্যাদা দেওয়া এবং তার স্বাধীনতা রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।