শিক্ষা ডেস্ক:
সাপ নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। শিকার না পেলে মাসের পর মাস, এমনকি এক বছরেরও বেশি সময় না খেয়ে দিব্যি টিকে থাকতে পারে এই রহস্যময় প্রাণী। এতদিন বিষয়টি বিজ্ঞানীদের কাছে এক বড় ধাঁধা থাকলেও, সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। গবেষকেরা বলছেন, এর পেছনে কাজ করছে সাপের শরীরের এক বিশেষ জিনেটিক পরিবর্তন।
রহস্যের মূলে ‘ক্ষুধা হরমোন’ ঘ্রেলিন
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত গবেষণার তথ্যমতে, সাপের এই দীর্ঘ সময় উপোস থাকার ক্ষমতার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে ‘ঘ্রেলিন’ (Ghrelin) নামক একটি হরমোনের মধ্যে। মানুষের শরীরে এই হরমোনটি পাকস্থলী থেকে নিঃসৃত হয়ে মস্তিষ্ককে খাওয়ার তাগিদ দেয়, যাকে বলা হয় ‘ক্ষুধা হরমোন’। কিন্তু সাপের ক্ষেত্রে চিত্রটি একদম উল্টো।
জিনের অনুপস্থিতিই বড় শক্তি
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় এবং পোর্তো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ১১২টি সরীসৃপ প্রজাতির জিনোম বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ৩২ প্রজাতির সাপ এবং কিছু গিরগিটির শরীরে ঘ্রেলিন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনটি প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। কিছু সাপের শরীরে এই জিনের ভাঙা অংশ পাওয়া গেলেও তা কার্যকর কোনো হরমোন তৈরি করতে পারে না।
শুধু ঘ্রেলিন নয়, এই হরমোনটি কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম ‘এমবিওএটি৪’ (MBOAT4)-ও এসব প্রাণীর শরীরে নেই। গবেষকদের মতে, এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং বিবর্তনের ধারায় সাপের টিকে থাকার এক অনন্য কৌশল।
বিপাকীয় হার ও শিকারের কৌশল
স্তন্যপায়ী প্রাণীরা না খেয়ে থাকলে ঘ্রেলিন হরমোন শরীরকে চর্বি পুড়িয়ে শক্তি সঞ্চয়ের নির্দেশ দেয় এবং খাবারের সন্ধান করতে উসকে দেয়। কিন্তু সাপ যেহেতু ‘সিট-অ্যান্ড-ওয়েট’ বা এক জায়গায় বসে শিকারের জন্য অপেক্ষা করার কৌশল অনুসরণ করে, তাই তাদের খাবার পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত।
এই অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সাপের শরীর থেকে এই ‘ক্ষুধা হরমোন’ বিদায় নিয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলেও তাদের বিপাকীয় হার বা মেটাবলিজম এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, যাতে শরীরের শক্তি খরচ সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে। এই অবিশ্বাস্য অভিযোজনের কারণেই সাপ অনায়াসে এক বছরেরও বেশি সময় না খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার শুধু সাপের রহস্যই ভেদ করেনি, বরং অন্যান্য প্রাণীর শরীরে ক্ষুধা ও বিপাক প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করে তা বোঝার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।