নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা:
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে সমাজ গঠনের লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প এখন জালিয়াতি, প্রশাসনিক গড়িমসি ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগে তীব্র বিতর্কের মুখে। খুলনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম (৮ম পর্যায়) প্রকল্পে জাল শিক্ষাগত সনদধারী এক কেয়ারটেকারকে শনাক্ত করার পরও পুনর্বহাল করা হয়েছে—এমন অভিযোগে প্রশাসনিক মহলসহ জনপরিসরে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আলোড়ন।
সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, যাচাই কমিটির আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণে জালিয়াতির প্রমাণ মিললেও তা বাস্তবায়নে রহস্যজনক বিলম্ব ও সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে, যা পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
যাচাই কমিটির সামনে ধরা পড়ে জাল সনদ
গত ৪ ডিসেম্বর ২০২৫, খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ কমিটি প্রকল্পের মডেল ও সাধারণ কেয়ারটেকারদের সনদ যাচাই শুরু করে।
যাচাই চলাকালে বটিয়াঘাটা উপজেলার ৭ নং আমিরপুর ইউনিয়নের সাধারণ কেয়ারটেকার মোঃ হুমায়ুন কবির খান-এর শিক্ষাগত সনদ জাল বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ আখতার হোসেন তাৎক্ষণিক ফাইল নোটে,
বিভাগীয় মামলা গ্রহণ,
বেতন-ভাতা ফেরত আদায়,
প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
শক্তিশালী কমিটি, কিন্তু বাস্তবায়নে ‘নীরবতা’
প্রকল্পের নিয়োগ কমিটিতে জেলা প্রশাসক বা তাঁর প্রতিনিধি আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সদস্য হিসেবে থাকেন পুলিশ সুপার, জিলা শিক্ষা অফিসার,ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।
তবে প্রশ্ন উঠেছে এত উচ্চপর্যায়ের তদারকি থাকা সত্ত্বেও কেন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি?
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি প্রকল্পে যাচাই শেষে ব্যবস্থা না নেওয়া প্রশাসনিক দায় এড়ানোর শামিল।
চার মাস পর ‘রহস্যজনক’ পুনর্বহাল
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—জাল সনদ শনাক্ত হওয়ার পর অভিযুক্তকে অপসারণ না করে প্রায় চার মাস পর পুনরায় সক্রিয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক সূত্র দাবি করেছে, পুনর্বহালের পেছনে প্রভাবশালী মহলের চাপ কিংবা আর্থিক লেনদেন থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
গণমাধ্যমে প্রকাশ না করার অনুরোধ?
ইসলামিক ফাউন্ডেশন খুলনার ফিল্ড অফিসার মোঃ তৌহিদুল ইসলাম-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছিলেন।
সূত্রের দাবি, তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন।
নিউজ না হলে বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব।
এই বক্তব্য প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীল আচরণ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
ফাইল স্বাক্ষরে বিভ্রান্তির অভিযোগ
খুলনা জেলার বিভাগীয় পরিচালক স্বীকার করেছেন, কিছু নথিতে তাঁর স্বাক্ষর বিভ্রান্তিকর তথ্য দেখিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, বিষয়টি পুনরায় যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সাবেক সুপারভাইজার মোঃ আবুল কাশেম জালিয়াতির বিষয়টি আগে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করলেও তা কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও যাকাত তহবিল নিয়েও তদন্ত
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে।
সাম্প্রতিক নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও সম্ভাব্য ফাঁসের অভিযোগ
যাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের তদন্ত
যা পুরো প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকেই নতুন করে সন্দেহের মুখে ফেলেছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নে নীরবতা
অভিযুক্তকে পুনর্বহালের বিষয়ে জানতে চাইলে বটিয়াঘাটা উপজেলা সুপারভাইজার মোঃ মহসিন আলী কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ঝুঁকিতে
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি সংস্থা হিসেবে ইসলামিক ফাউন্ডেশন দেশজুড়ে মসজিদভিত্তিক শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে, যার লক্ষ্য ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন প্রকল্পে নিয়োগ জালিয়াতি প্রমাণিত হলে তা শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতাই নয়, বরং ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রমের প্রতি জনআস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
‘জিরো টলারেন্স’ বার্তা প্রশাসনের
জেলা প্রশাসনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তের দাবি জোরালো
সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত
স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত ছাড়া এই বিতর্কের অবসান সম্ভব নয়। দ্রুত জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে দেশের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় শিক্ষা উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।