পবিত্র রবিউল আউয়াল মাস প্রায় শেষ হয়ে আসছে। সমগ্র বিশ্বের আশেকে রাসুল (সা.) তথা নবী প্রেমীরা নানাভাবে মাসটি উদযাপন করেছেন। আমিও পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সা. মেহফিল প্রতিবছরের মতো এ বছরও ভক্তি, মহব্বত ও আদবের সহিত পালন করেছি। মেহফিলে সকল স্তরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং খানকাহ শরীফের সকল মুরীদান, অসংখ্য আশেকে রাসূল, বরেণ্য শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ঠ ব্যবসায়ী, সরকারের উচচপদস্থ’ কর্মকর্তা, সাংবাদিক, ওলামা মাশায়েক ও ভক্তরা অংশ গ্রহণ করেছিলেন ।
তবে আমার প্রশান্তি প্রিয় নবীর শানে আমার বাবা হুজুর কেবলার দেখানো পথে আমি প্রায় দীর্ঘ ৭ যুগের অধিক সময় তথা ৮৫ বছর ধরে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার বার দরূদ শরীফ ও খতমে খাঁজেগান এবং প্রতি আরবী মাসে চাঁন্দের ১১ তারিখ বাদে এশা এগারো শরীফের আমল, মিলাদ ও কেয়াম শরীফের বরকতী আমল, হামদ ও নাঁত শরীফ, শানে বেলায়াত, বুর্দায়ে বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী, কাসিদায়ে খাজা গারিবে নেওয়াজ ও আশিকী কালামের মজলিশ প্রচলন রাখার তাওফিক দান করেছেন।
মুসলিম বিশ্বের কোথাও প্রায় ৮৫ বছরধরে বিরতিহীনভাবে প্রতিদিন ৫ হাজার বার প্রিয় নবীর শানে দরুদ শরীফ পড়ার নজীর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই।
মহামারী করোনার সময়ও প্রিয় নবীজির শানে এই রেওয়াজ চালু রাখার তৌফিক দিয়েছিলেন মহান রাব্বুল আলামিন। আমার অভিমত শুধু রবিউল আউয়াল মাসে নয়, সারা বছরই প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে স্মরণ করতে হবে প্রিয় নবী সা. এর উম্মতদের। এই মাসটি রাসূল (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের মাস হওয়ায় বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ, তবে মুমিন মুসলমানদের ঈমানের দাবি হলো, তারা যেন সারা বছর রাসূল (সা.)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করে এবং তাঁর সুন্নাহকে অনুসরণ করে। রবিউল আউয়াল মাস রাসূল (সা.)-এর বেলাদাত (জন্ম), নবুয়ত এবং হিজরতের মাস হওয়ায় এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এই মাসে এই স্মৃতিগুলো স্মরণ করার পাশাপাশি সারা বছরই তা অনুসরণ করা উচিত। সোমবার রোজা রাখা উত্তম এটি একটি সুন্নাহ, যা রাসূল (সা.) পালন করতেন এবং যা সারা বছরই করা আরো বেশ উত্তম । রবিউল আউয়াল মাসে মুসলিম উম্মাহকে একত্রিত করার পাশাপাশি অসহায় ও দুস্থদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো, দান করা এবং সমাজসেবায় অংশ নেওয়া এই মাসে বিশেষ গুরুত্ব রাখে। এই কাজগুলোও সারা বছর করা যেতে পারে। সুতরাং মুমিন মুসলমানের ঈমানের দাবি হলো, তারা সারা বছর প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠানো।
হিজরি সালের তৃতীয় মাস হলো রবিউল আউয়াল। ‘রবি’ অর্থ বসন্তকাল, ‘আউয়াল’ অর্থ প্রথম; ‘রবিউল আউয়াল’ মানে প্রথম বসন্ত বা বসন্তকালের প্রথম মাস। রবিউল আউয়াল ইসলামের বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস। এ মাসে ইসলামের শেষ নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর জন্মদিন পালন করা হয়। এ মাসটির নাম ‘রবিউল আউয়াল’ হওয়ার কারণ হচ্ছে, প্রাক-ইসলামি আরব পঞ্জিকা অনুসারে এটি ছিল প্রথম মাস। ইসলাম ধর্মীয় মতানুসারে, এটি একটি শুভ মাস। প্রিয় নবীজি (সা.)-এর বহুমাত্রিক স্মৃতিধন্য এ মাস, মানবসভ্যতার ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। মুসলিম মানসে এ মাস শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও মহিমায় পরিপূর্ণ। মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) ১২ রবিউল আউয়াল দুনিয়াতে শুভাগমন করেন। ‘তিনি সেই মহান সত্তা যিনি পাঠিয়েছেন তার দূত হেদায়েত ও সত্য ধর্মসহ সে ধর্মকে সব ধর্মের ওপর বিজয়ী করার জন্য। সাক্ষ্যদাতা রূপে আল্লাহই যথেষ্ট’।
রবিউল আউয়াল মাসটি মুসলিম সমাজে নবী করিম (সা.)-এর জন্মেরও স্মারক হিসাবে পালিত হয়, যা ‘ফাতিহায়ে দোয়াজ-দাহম’ নামে পরিচিত। ‘ফাতিহায়ে দোয়াজ-দাহম’ কথাটি ফারসি ভাষা থেকে আগত। দোয়াজ-দাহম মানে ১২, ফাতিহায়ে দোয়াজ-দাহম অর্থ হলো ১২ তারিখের ফাতিহা অনুষ্ঠান। কালক্রমে দিনটি ‘মিলাদুন্নবী (সা.) নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এর অর্থ হলো প্রিয় নবী (সা.)-এর জন্মানুষ্ঠান। ধীরে ধীরে এর সঙ্গে ‘ঈদ’ শব্দ যোগ হয়ে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) রূপ লাভ করে। যার অর্থ হলো মহানবী (সা.)-এর জন্মোৎসব। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত আমাদের প্রিয়নবী মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আরবের মক্কা নগরীর সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে মা আমিনার কোল আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। রিসালাতের দায়িত্ব পালন শেষে ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে ঠিক এ তারিখেই ৬৩ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায় এ দিনটি পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) হিসেবে পালন করে থাকে।
বকশি বাজার দরবার শরীফ শুধু একটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্রই নয়, বরং সুফিবাদের আলোকে ইসলামি মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং আর্তমানবতার সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসা এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। এ কারণে ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস এখানে বিশেষভাবে পালিত হয়। আধ্যাত্মিক ও মানবতার সেবক হিসেবে আমার শুধুই ধ্যান কেবল সেবা নয়, মানুষকে দাও তোমার হৃদয় এবং নিঃস্বার্থ প্রেম। হৃদয়হীন সেবা নয়, তারা চায় তোমার অন্তরের স্পর্শ এরকম প্রেমের উক্তি যাঁর মুখেই কেবল সীমাবদ্ধ নয়; অনেকে আমাকে আর্তমানবতার সেবক, মানবতার ফেরিওয়ালা হিসেবে বলেন। আমি নিজের উপার্জিত অর্থে প্রায় ৪ যুগ ধরে আধ্যাত্মিক ও মানবসেবার খেদমতে নিয়োজিত, চার তরিকার অনন্য মার্কাজ, খানকাহ ফকির জহুর আল কাদরী দরবার। আমি সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা অবহেলিত, বঞ্চিত, অনাথ, তাদেরই বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাওয়ার প্রয়াসী মাত্র। মানবিক সমাজ বিনির্মাণ ও মানবিকতা পূর্ণ সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে কাজ করে যাই নীরবে নিভৃতে।
আত্মশুদ্ধি ও আত্মতৃপ্তিই আমার মূল উদ্দেশ্য। মানবতার কল্যাণে নিজেকে কিভাবে বিলিয়ে দেয়া যায় তাই আমার ধ্যান। সেই দোয়া করি যেন সকল মুরিদান নিজ নিজ সাধ্য অনুযায়ী অন্তরে মোহাব্বত, ইশক ও ভালোবাসা ভক্তি সহকারে পবিত্র রবিউল আওয়াল মাসে শুধু নয় সারাবছর ও আমৃত্যু প্রিয় নবীজির শানে দরুদ শরীফ জারি রাখতে পারেন আমিন।
লেখক: বিশিষ্ট সুফি স্কলার, গবেষক, সাজ্জাদানীশিন বকশী বাজার খানকাহ শরিফ, ঢাকা।