• রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬, ০১:১০ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
Headline
জগন্নাথপুর যুব ফোরাম এর ব্যবস্হাপনায় মাহে রমজান উপলক্ষে ইফতার সামগ্রী বিতরণ বটিয়াঘাটায় মৎস্য ঘেরে বিষ প্রয়োগ করে লক্ষাধিক টাকার ক্ষতির অভিযোগ কবিতাঃ শেষ অধ্যায়ের নীরবতা ​‘খামেনি মারা গেছেন’, ট্রুথ সোশ্যালে বিস্ফোরক দাবি ট্রাম্পের সিংগাইরে অবৈধভাবে কৃষি জমির টপসয়েল কাটায় ভ্রাম্যমান আদালতে রাতে অভিযান জেল জরিমানা জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জকে মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলা হবে- এমপি কয়ছর আহমেদ রামাদ্বান উপলক্ষ্যে গোয়াইনঘাট ছাত্র পরিষদের উদ্যোগে বই বিতরণ অপেক্ষা করুন মার্চের মধ্যেই পরিবর্তন দেখবেন: গোয়াইনঘাটবাসীকে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর আশ্বাস মাননীয় প্রতিমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে সংবর্ধনা জানান সাংবাদিক মো. বায়েজিদ বোস্তামী গোয়াইনঘাটে কেয়ার হসপিটালের উদ্যোগে পথচারীদের মাঝে ইফতার বিতরণ ও দোয়া মাহফিল সম্পন্ন

মঠবাড়িয়ায় মৌসুমি মামলার হিরিক: বাড়ি ছাড়া ৬ সাংবাদিক, নিন্দার ঝড়

Reporter Name / ৩৩২ Time View
Update : শনিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

 

শেখ সাইফুল ইসলাম কবির

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা অনেক চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে, বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত অঞ্চলগুলোতে। সম্প্রতি পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলায় ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা দেশের স্বাধীন সাংবাদিকতার উপর এক অশনি সংকেত হয়ে দেখা দিয়েছে। একটি সুপরিকল্পিত চক্র সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলার হিরিক তুলে, তাদের হয়রানি করে, ভয় দেখিয়ে এবং মামলার ফাঁদে ফেলে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেছে। এখন পর্যন্ত ৬ জন সাংবাদিককে আলাদা আলাদা মামলায় আসামি করা হয়েছে, যারা আতঙ্কে নিজ বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

এই ঘটনায় দেশের বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেমন সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, তেমনি রাজনীতিক, মানবাধিকারকর্মী ও পেশাজীবী মহলেও উদ্বেগ ছড়িয়েছে। এই ঘটনা শুধু স্থানীয় সাংবাদিকদের জন্য নয়, বরং দেশের মুক্ত গণমাধ্যম ও বাক-স্বাধীনতার জন্যও এক অশুভ ইঙ্গিত বহন করে।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা: একটি পটভূমি

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, বৃহষ্পতিবার, মঠবাড়িয়ার গুলিশাখালী ইউনিয়নের ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হারুন অর রশিদ স্থানীয় থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে একটি মামলা করেন। মামলায় ১০২ জনকে এজাহারভুক্ত আসামি এবং প্রায় ২০০ জনকে অজ্ঞাতনামা রাখা হয়। মামলাটির নম্বর ১৫/২৫ এবং তাং ১৮/৮/২৫। এর মধ্যে সাংবাদিক মোস্তফা কামাল বুলেট (দৈনিক যায় যায় দিন প্রতিনিধি) এবং নাসির উদ্দিন (দৈনিক বর্তমান কথা স্টাফ রিপোর্টার) -কে সরাসরি আসামি করা হয়।

এরপর একে একে অন্যান্য সাংবাদিকদের নামেও মামলা হয়। মামলা নম্বর ২৬/২৫ (তাং ২৫/৮/২৫) -এ সাংবাদিক এজাজ উদ্দিন চৌধুরী (দৈনিক আমাদের কণ্ঠ), আবুল কালাম আজাদ ও ফারুক হোসেনকেও আসামি করা হয়। একইভাবে, মামলায় সাংবাদিক ও মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি জাহিদ উদ্দিন পলাশকে (মামলা নং ৩১/২৫, তাং ২৩/২/২৫) আসামি করা হয়।

এতগুলো মামলায় একই ধরনের ধারা, অভিযোগ ও সাক্ষীদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিত একটি ষড়যন্ত্রের অংশ। এই ষড়যন্ত্রের পেছনে কারা আছে তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত না হলেও, স্থানীয় রাজনৈতিক স্বার্থন্বেষী মহল এবং প্রশাসনের কিছু অংশের জড়িত থাকার আশঙ্কা অমূলক নয়।

আতঙ্কে এলাকা ছাড়ছেন সাংবাদিকরা

এসব মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিকদের অনেকেই এখন নিজ এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন। শুধু সাংবাদিক নয়, তাদের পরিবারের সদস্যরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অজ্ঞাতনামা আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান আরও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

যে সাংবাদিকরা সত্য তুলে ধরেন, জনস্বার্থে কাজ করেন, তারাই এখন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য এটি এক গভীর সংকট। শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কথা নয়, বরং সামগ্রিকভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছে।

সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

এই ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উপজেলা বিএনপির সাবেক আহবায়ক রুহুল আমিন দুলাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে মামলাগুলোকে ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেন। যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক এ আর মামুন খান তার ফেসবুক পেইজে মামলাগুলোকে ‘মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক’ বলে উল্লেখ করেন এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন) দায়ী করেন।

এছাড়াও পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি কে এম হুমায়ুন কবির বলেন, “যে মামলা করেছেন এবং নিয়েছেন, তারাই জানেন। আমরা এ বিষয়ে কিছু জানি না।” তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয় এবং মামলার দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা প্রকাশ করে।

অন্যদিকে, মঠবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন দাবি করেছেন, যেহেতু ২০২৩ সালের ঘটনার সত্যতা আছে, তাই কেউ অভিযোগ করলে পুলিশ মামলা নিতে বাধ্য। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে — সাংবাদিকদের কীভাবে সেই ঘটনার সাথে যুক্ত করা হচ্ছে? কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়াই কীভাবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া হয়?

মতামত ও বিশ্লেষণ

সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয়। সত্য প্রকাশ করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করাই একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের কারণে যদি তাকে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়, তবে সেটি রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক ব্যর্থতার পরিচায়ক।

মঠবাড়িয়ার এই ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে একটি ভীতিকর বার্তা দিচ্ছে: যারা সত্য বলবেন, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হবে। সাংবাদিকদের ওপর এই চাপ কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, এসব মামলার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ভিন্ন মত দমনের চেষ্টা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এক ধরনের সংঘবদ্ধ অপচেষ্টা কাজ করছে। এটি শুধু মঠবাড়িয়ার ঘটনা নয়, বরং সারাদেশের জন্য একটি সতর্ক সংকেত।

করণীয় ও সুপারিশ

১. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলো তদন্ত করে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা বাতিল করতে হবে।

২. মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

৩. সরকারি প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট পরিষ্কার করতে হবে।

৪. মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি বন্ধে একটি শক্তিশালী আইনগত কাঠামো তৈরি করতে হবে।

৫. সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ ও আইনি সহায়তা কার্যক্রম চালাতে হবে।

উপসংহার

মঠবাড়িয়ার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বা স্থানীয় ঘটনা নয়, এটি সারাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের প্রতি চ্যালেঞ্জ। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে সরকার, সিভিল সোসাইটি এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। সাংবাদিকতার উপর এই অব্যাহত চাপ ও হয়রানি শুধু একটি পেশা নয়, বরং একটি জাতির বিবেককেই বন্দী করার সমতুল্য।

মঠবাড়িয়ার এই ঘটনাগুলো যেন আর কোথাও না ঘটে— এটাই এখন সময়ের দাবি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd