জগন্নাথপুর প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ) আসনের নির্বাচনী ময়দানে এখন সম্পূর্ণ নতুন এক রাজনৈতিক সমীকরণ দৃশ্যমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে জোরালো ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা। এই আসনে মূলত ধানের শীষ বনাম তালা প্রতীকের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভোট বিভাজনের প্রেক্ষাপটে এবি পার্টি মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ তালহা আলমের ঈগল প্রতীকের শক্তিশালী অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সচেতন ভোটারদের মতে, বড় দুই প্রার্থীর ভোট বিভাজন এবার ঈগলের অনুকূলে বড় ধরনের চমক তৈরি করতে পারে।
বিএনপির দলীয় প্রার্থী কয়ছর এম আহমেদের ধানের শীষ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেনের তালা প্রতীকের মধ্যে এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জের বিএনপি ঘরানার ভোটাররা এখন দুই ভাগে বিভক্ত। আঞ্চলিক ভোটের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, কয়ছর এম আহমেদের জগন্নাথপুরে শক্ত ভোটব্যাংক থাকলেও ব্যারিস্টার আনোয়ারের কারণে শান্তিগঞ্জে তার সুবিধাজনক অবস্থানে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ। অন্যদিকে, ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেনের মূল শক্তির জায়গা শান্তিগঞ্জ হলেও জগন্নাথপুরের সব স্থানে তার ভোটব্যাংক সেভাবে গড়ে ওঠেনি। ঠিক এই জায়গাতেই ব্যতিক্রম সৈয়দ তালহা আলম; জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ—উভয় উপজেলাজুড়েই তার একটি বিশাল নীরব ভোটব্যাংক রয়েছে যা যেকোনো সময় ভোটের ফলাফল পাল্টে দিতে পারে।
নির্বাচনের মাঠে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন দলটির নায়েবে আমীর, সাবেক এমপি মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী। বিতর্কিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও রাজনীতিতে ডিগবাজীর কারণে এবারের নির্বাচনে তার অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। জোটগত রাজনীতির মারপ্যাঁচ এবং স্থানীয় পর্যায়ে পূর্বের মতো সুসংগঠিত টিমওয়ার্কের অভাবে তার ভোটারদের একটি বড় অংশ বিকল্প নিয়ে ভাবছে।
অন্যদিকে, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শেখ মুশতাক আহমেদও ভোটের মাঠে রয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লড়াইয়ের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ধানের শীষ, তালা ও ঈগল।
নির্বাচনী প্রচারণার এক পর্যায়ে নিজের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে সৈয়দ তালহা আলম বলেন, তিনি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য নয়, বরং জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জের প্রতিটি অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ে লড়াই করছেন। তার মতে, মানুষ এখন প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে মুক্তি চায়। করোনা কিংবা ভয়াবহ বন্যা—বিপদের সময় তিনি যেভাবে সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন, নির্বাচিত হয়েও সেভাবেই সেবা করে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তার বিশ্বাস, ঈগল প্রতীক এখন ওই অঞ্চলের মানুষের কাছে একটি নির্ভরযোগ্য ভরসার প্রতীক হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
এবি পার্টির এই প্রার্থী গত কয়েক সপ্তাহে সুনামগঞ্জ-৩ আসনের ১৬টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় ঝোড়ো প্রচারণা চালিয়েছেন। বিশেষ করে করোনা মহামারী এবং ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় তার সক্রিয় উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মনে গভীর আস্থা তৈরি করেছে। শিক্ষিত তরুণ সমাজ এবং সাধারণ ভোটারদের কাছে তালহা আলম এখন উন্নয়ন ও সততার প্রতিচ্ছবি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। শান্তিগঞ্জ উপজেলার এক তরুণ ভোটার তার অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন যে, তারা দীর্ঘদিনের গতানুগতিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এমন কাউকে চান যাকে বিপদে পাশে পাওয়া যায় এবং যার ইমেজ পরিষ্কার।
নির্বাচনী মাঠের আরেকটি বড় ফ্যাক্টর হলো সাবেক মন্ত্রী এম এ মান্নানের বিশাল ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক। শান্তিগঞ্জের স্থানীয় সন্তান হওয়ার সুবাদে ব্যারিস্টার আনোয়ারের দিকে কিছু ভোট ঝুঁকলেও, ভোটারদের একটি বড় অংশ সৈয়দ তালহা আলমের আধুনিক ও মানবিক নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইয়াসিন খান নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোয় তাদের নিরেট ভোটব্যাংকটিও ঈগল প্রতীকের দিকে ধাবিত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জোটগত সমঝোতা এবং পর্দার আড়ালে জামায়াত কর্মীদের তৎপরতা তালহা আলমের অবস্থানকে মাঠ পর্যায়ে আরও সুসংহত করছে।
সব মিলিয়ে জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জের ভোটাররা এবার প্রতীক দেখে নয়, বরং প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও সংকটকালে মানুষের পাশে থাকার ইতিহাস বিবেচনা করেই রায় দেবেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আর এই জনমতের মানদণ্ডে ধান ও তালার পারস্পরিক লড়াইয়ের মাঝে ঈগল প্রতীক নিয়ে সৈয়দ তালহা আলম বড় ধরনের বাজিমাত করার অপেক্ষায় আছেন।