মো. রকিবুল হাসান বিশ্বাস, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) থেকে:
মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা জুড়ে অবাধে চলছে ৩ ফসলি কৃষি জমির উর্বর মাটি কাটা। আবাসিক এলাকা ও তিন ফসলি জমির ওপর গড়ে ওঠা অন্তত ৫৮ টি ইটভাটায় প্রতিদিন ব্যবহার হচ্ছে এসব মাটি। ফলে বিস্তীর্ণ আবাদি জমি পরিনত হচ্ছে গভীর গর্ত ও ডোবা-নালা,ব্যাহত হচ্ছে খাদ্য উৎপাদন, বিপর্যস্ত হচ্ছে পরিবেশ ও গ্রামীন অবকাঠামো।
উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে ইটভাটা রয়েছে বলধারায় ২৭টি, চান্দহরে ১৩টি, জার্মিত্তায় ৬টি, বায়রায় ৬টি, চারিগ্রামে ৩টি, ধল্লায় ২টি এবং সদর ইউনিয়নে ১টি ।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। বন্ধ হওয়া কয়েকটি ভাটা নতুন নামে বা ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রোববার সরেজমিনে বলধারা ইউনিয়নে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি গভীর খাদে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে মাটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন কুদ্দুস কোম্পানি, তার ভাই মহর আলী, লালন মিয়া ও ভাতিজা রবিন। এছাড়া সোহেল, মিন্টু, জিয়া, আকবর, নুরু ও টুটুলের নামও উঠে এসেছে।
খোলাপাড়া মৌজার বদ্দর চক এলাকার ভুক্তভোগী আমিনুর ইসলাম, ইদ্রিস আলী ও ফারুক আহমেদ অভিযোগ করেন, পাশের জমি গভীর করে মাটি কাটায় তাঁদের তিন ফসলি জমি ভেঙ্গে পড়ছে। লালন মিয়ার বিরুদ্ধে কমদামে জমি কিনতে চাপ ও হুমকির অভিযোগও করেন তারা। এ বিষয়ে সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যের কাছে অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
জার্মিত্তা ইউনিয়নের হাতনি ও জাইল্লা চকে ৬টি ইটভাটা সচল রয়েছে, যার চারটি ভাড়ায় পরিচালিত। স্থানীয়দের দাবি, রিপন, আইনুল, সাদিক, আরিফুল, মঞ্জু, আলামিন, রাজু ও দ্বীন ইসলামের নেতৃত্বে চলছে মাটি কাটা। রাতের আঁধারে ড্রাম ট্রাকে মাটি পরিবহনের কারণে গ্রামীণ সড়ক ভেঙে পড়ছে।
চান্দহর ইউনিয়নের রিফায়েতপুর, ওয়াইজনগর, বাঘুলি ও চালিতাপাড়া চকে গড়ে ওঠা ১৩টি ভাটার জন্যও স্থানীয় কৃষিজমি থেকে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে। মালেক, রেহানুল রায়হান, ইজ্জত আলী, লাল মিয়া, মনির, শহিদুল, হুসো, কাইল্লা হাসান,মোশারফ ও সেলিমের নাম উল্লেখ করেছেন এলাকাবাসী।
চারিগ্রাম ইউনিয়নে জাহাঙ্গীর, হলু বেপারী, বাবুল ও হালিম; জামশায় জাহাঙ্গীর, কাদের, আমিনুল ও বাবুল; বায়রায় নাসির ও জামিলের বিরুদ্ধে মাটি কাটার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, দিনের বদলে রাতকে বেছে নিয়ে চলছে টপসয়েল কাটা। এতে প্রতিবছর ফসলি জমি ডোবা-নালায় পরিণত হচ্ছে। ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় বাড়ছে বায়ুদূষণ, ভারী ট্রাক চলাচলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাকা-আধাপাকা সড়ক।
উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মো. ইলিয়াস খান বলেন,অধিকাংশ ভাটা ভাড়ায় পরিচালিত। মাটি ছাড়া ভাটা চলবে না। মাটির ব্যবসায়ীরা ভাটার সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয়—প্রশাসন চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারে।” তিনি স্বীকার করেন, অন্তত চারটি ভাটা অবৈধ।
সিংগাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, ফসলি জমির মাটি কাটা অন্যায়। মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় পুলিশ সহযোগিতা করছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার মোহাম্মদ. হাবিবুল বাশার চৌধুরী বলেন, এ উপজেলায় একটি ইটভাটাও বিধিসম্মত নয় এবং কৃষি বিভাগের মতামত নেওয়া হয় না।
পরিবেশ অধিদপ্তর মানিকগঞ্জের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, অবৈধ ভাটা ও কৃষি জমির মাটিকাটা বন্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় প্রস্তুত রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. হাবেল উদ্দিন বলেন, চলতি মৌসুমে টপসয়েল কাটার অভিযোগে সাড়ে ৭ লাখ টাকা জরিমানা এবং ৩টি ভেকু অকার্যকর করা হয়েছে। “যেখানেই অভিযোগ পাচ্ছি, সেখানেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।