নিজস্ব প্রতিবেদক:
পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) যৌথ হামলায় ‘জনতার বিপ্লব ২৪’ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক উম্মে কুলসুম খন্দকার আহত হয়েছেন। ৬ ই ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বিকেলে শাহবাগ ও বাংলামোটরে এই ঘটনা ঘটে।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদীর হত্যার বিচার দাবিতে আয়োজিত শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে এই হামলার শিকার হন তিনি। এ ঘটনায় সাংবাদিক সমাজে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে ‘জনতার বিপ্লব ২৪’ পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানীর যমুনা এলাকায় হাদী হত্যার বিচারের দাবিতে হাজার হাজার মানুষের জমায়েত ঘটে। আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রধান উপদেষ্টা হাদীর জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—খুনিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার—তার কোনো বাস্তবায়ন আজও হয়নি। হত্যার প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও খুনিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে, যা জনমনে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি করেছে।
প্রতিশ্রুতি ছিল, বিচার নেই—জনতার প্রশ্ন
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদী হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে শুরু থেকেই জনমনে ছিল ব্যাপক আলোড়ন। তার জানাজায় উপস্থিত প্রধান উপদেষ্টা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা হবে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, হত্যার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন বাকি থাকলেও হাদী হত্যার বিচার না হওয়ায় জনতার মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—নির্বাচনের পর যখন বর্তমান উপদেষ্টারা অবসরে চলে যাবেন, তখন কে নেবে এই হত্যার বিচারের দায়িত্ব? আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অনিশ্চয়তাই জনতাকে রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশের হিংস্রতা
হাদীর খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচিকে সমর্থন জানিয়ে হাজার হাজার মানুষ যমুনা এলাকায় জড়ো হন। আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য ছিল—প্রধান উপদেষ্টার কাছে জাতিকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট জবাব চাওয়া।
কিন্তু আন্দোলন শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কোনো উসকানি ছাড়াই পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে লাঠিচার্জ ও ধাওয়া শুরু করে। এতে সাংবাদিকসহ বহু আন্দোলনকারী আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যাতে আন্দোলন দমিয়ে রাখা যায়।
সাংবাদিকের ওপর হামলা—গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হুমকি
এই হামলায় আহত হন ‘জনতার বিপ্লব ২৪’ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক উম্মে কুলসুম খন্দকার। দায়িত্ব পালনকালে একজন সম্পাদক ও প্রকাশকের ওপর হামলার ঘটনাকে সাংবাদিক সমাজ অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে। আন্দোলনস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকরা জানান, সংবাদ সংগ্রহ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে তিনি হামলার শিকার হন।
‘জনতার বিপ্লব ২৪’-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এম. কে. জাকির হোসাইন বিপ্লবী এ ঘটনায় গভীর শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন,
“একজন সম্পাদক ও প্রকাশকের ওপর এই বর্বর হামলা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। এটি শুধু একটি পত্রিকার ওপর আঘাত নয়, বরং স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত।”
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
‘জনতার বিপ্লব ২৪’ পরিবারের তীব্র প্রতিবাদ
সম্পাদকের আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে ‘জনতার বিপ্লব ২৪’ পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়া ও সংবাদ সংগ্রহ করা কোনো অপরাধ নয়। অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যা রাষ্ট্রের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক ওমর ফারুক বলেন,
“সম্পাদকের ওপর হামলার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে এবং হামলাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত না করা হলে দেশ ভয়াবহ সংকটের দিকে এগিয়ে যাবে।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন,
“আজকের এই হামলার বিচার না হলে জনগণ আইনের প্রতি বিশ্বাস হারাবে। তখন মানুষ নিজেই আইন হাতে তুলে নিতে বাধ্য হবে, যা রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।”
সামাজিক মাধ্যমে নিন্দার ঝড়
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশ-বিদেশের সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। আলো মিডিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আহমেদ হোসাইন ছানু সামাজিক মাধ্যমে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন,
“গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করে দেশে ভারতীয় আধিপত্য বিস্তার করতে চায় সরকার। জনতার বিপ্লবের সম্পাদক আহত হওয়ার ঘটনা আমাদের সবাইকে বাকরুদ্ধ করেছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”
তার এই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
নির্বাচন, দমননীতি ও জনআস্থার সংকট
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের দমনমূলক আচরণ জনআস্থার সংকটকে আরও গভীর করবে। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা জরুরি। কিন্তু পুলিশের হামলার ঘটনায় সেই পরিবেশ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
হাদী হত্যার বিচার না হওয়া এবং বিচার দাবিতে আন্দোলনে হামলা—এই দুই বিষয় মিলিয়ে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারীদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলতে থাকলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কখনোই সম্ভব হবে না।
হাদী হত্যার বিচার—কেন জরুরি
ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা বলেন, হাদী হত্যার বিচার শুধু একটি ব্যক্তির জন্য নয়, এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতীক। যদি একজন রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠকের হত্যার বিচার না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
তারা দাবি করেন, হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে প্রকাশ্যে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় জনগণের ক্ষোভ আরও বিস্ফোরক রূপ নিতে পারে।
সাংবাদিক সমাজের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ
সাংবাদিক সংগঠনগুলো এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছে। তারা বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা মানে সত্যের ওপর হামলা। গণমাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে চুপ করানো গেলে সাময়িক লাভ হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
একাধিক সাংবাদিক নেতা মনে করেন, এই ঘটনার বিচার না হলে ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রবণতা আরও বেড়ে যাবে।
পুলিশ ও বিজিবির হামলায় ‘জনতার বিপ্লব ২৪’-এর সম্পাদক ও প্রকাশকের আহত হওয়ার ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। হাদী হত্যার বিচার না হওয়া, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে দমননীতি, সাংবাদিকদের ওপর হামলা—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
‘জনতার বিপ্লব ২৪’ পরিবারসহ সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি—হাদী হত্যার দ্রুত বিচার, সম্পাদক ও প্রকাশকের ওপর হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় জনতার ক্ষোভ ও অনাস্থা আরও গভীর হবে, যার দায় এড়াতে পারবে না রাষ্ট্র।