মোছা: কাতেবুন্নেসা পারভীন
সমাজে একটি পুরোনো প্রবচন আছে—“যত দোষ নন্দ ঘোষের উপরে।” অর্থাৎ, নিজের দায় এড়িয়ে অন্যের ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি এগিয়েছে, শিক্ষার হার বেড়েছে—কিন্তু এই মানসিকতা যেন রয়ে গেছে আগের মতোই।
বিশেষত কর্মক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো সম্মানজনক জায়গায়, কখনো কখনো এমন এক অদ্ভুত সংস্কৃতি তৈরি হয় যেখানে ব্যক্তিগত আক্রোশকে নৈতিকতার মুখোশ পরিয়ে পরিবেশন করা হয়। কেউ নিজেকে নির্মলতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন, আর অন্যদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন খুব সহজেই। যেন নৈতিকতার একমাত্র রক্ষক তিনিই।
দুঃখজনক বিষয় হলো, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৌতূহল, গুজব বা ইঙ্গিত—এসবকে অনেক সময় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রমাণের তোয়াক্কা না করে অভিযোগ ছুড়ে দেওয়া হয়, আর অভিযোগের ভার বহন করতে হয় অভিযুক্তকেই। অথচ ন্যায়বোধের একটি মৌলিক নীতি হলো—প্রমাণ ছাড়া অপবাদ অন্যায়।
আরও বিস্ময়কর হলো, কিছু মানুষ এমন এক প্রভাববলয় তৈরি করতে সক্ষম হন যেখানে ভিন্নমত প্রকাশ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ভয়ের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে নীরবতার সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। সহকর্মীরা অস্বস্তি অনুভব করলেও মুখ খোলেন না। কারণ তারা জানেন, প্রশ্ন তুললেই “নন্দ ঘোষ” হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
এখানে প্রশ্ন ব্যক্তি নয়, প্রবণতা। আমরা কি সত্যিই এমন একটি কর্মপরিবেশ চাই, যেখানে নৈতিকতার ভাষণ থাকবে, কিন্তু সহমর্মিতা থাকবে না? যেখানে চরিত্রহনন সহজ, কিন্তু আত্মসমালোচনা কঠিন?
নৈতিকতা কখনো উচ্চস্বরে ঘোষণা করার বিষয় নয়; এটি নীরব চর্চার বিষয়। যারা সত্যিই স্বচ্ছ, তারা অন্যকে ছোট করে নিজেকে বড় প্রমাণ করার প্রয়োজন অনুভব করেন না। বরং তারা জানেন—অন্যের সম্মান রক্ষা করাও নিজের সম্মান রক্ষার অংশ।
অভিযোগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে আমরা যেন ভুলে না যাই—প্রতিটি মানুষেরই ব্যক্তিগত পরিসর আছে, আছে সম্মানের অধিকার। সমাজ বা প্রতিষ্ঠান তখনই সুস্থ থাকে, যখন সমালোচনা হবে যুক্তিনির্ভর, অভিযোগ হবে প্রমাণভিত্তিক, আর সম্পর্ক হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধার উপর দাঁড়িয়ে।
অতএব, “যত দোষ নন্দ ঘোষের উপরে” বলার আগে আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত আয়নার সামনে দাঁড়ানো। কারণ সত্যকে আড়াল করা যায় কিছু সময়ের জন্য, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সত্যের আলোই টিকে থাকে।
লেখক:
মোছা: কাতেবুন্নেসা পারভীন, শিক্ষক এবং কলামিস্ট। সৈয়দপুর, নীলফামারী।