সাবিত রিজওয়ান, স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর কথা বললে লুৎফুজ্জামান বাবরের নাম অবধারিতভাবেই চলে আসে। বিশেষ করে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের এই প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভূমিকা প্রতিবেশী দেশ ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে দীর্ঘকাল ছিল এক ‘আতঙ্কের’ নাম। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে অস্থিতিশীলতা তৈরিতে বাবরের তথাকথিত ভূমিকা নিয়ে আজও গোয়েন্দা মহলে নানা সমীকরণ মেলানো হয়।
সেভেন সিস্টার্স ও বাবরের প্রভাব
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য, যা ‘সেভেন সিস্টার্স’ নামে পরিচিত—সেখানকার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে মদত দেওয়ার ক্ষেত্রে লুৎফুজ্জামান বাবরের কৌশল নিয়ে দীর্ঘকাল আলোচনা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীন বা পাকিস্তান যা করতে পারেনি, বাবর তাঁর স্বল্প মেয়াদে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তার চেয়ে বেশি অস্থিরতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর সময়ে অরুণাচল, আসাম, ত্রিপুরাসহ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর আন্দোলনকারীরা ব্যাপক সক্রিয় হয়ে উঠেছিল বলে মনে করা হয়।
১০ ট্রাক অস্ত্রের সেই রাত
২০০৪ সালের পহেলা এপ্রিল রাতে চট্টগ্রামের সিইউএফএল জেটিতে ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আটকের ঘটনা। সমুদ্রপথে দুটি ট্রলারে করে আসা এই বিশাল চালানে ছিল চীনের তৈরি একে-৪৭ রাইফেল, রকেট লঞ্চার, হ্যান্ড গ্রেনেড এবং কয়েক লাখ রাউন্ড গুলি।
নথিপত্র অনুযায়ী, সেই উদ্ধার অভিযানে ১ হাজার ৭৯০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৭ হাজার গ্রেনেড এবং ১৫০টি রকেট লঞ্চার জব্দ করা হয়েছিল। এই ঘটনাটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ইতিহাসে এক ‘শীতল’ অধ্যায়ের সূচনা করে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাবি ছিল, এই বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্যই আনা হয়েছিল। যদিও বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে তখন দাবি করা হয়েছিল, সরকারের সদিচ্ছা ছিল বলেই এই বিশাল চালান আটক করা সম্ভব হয়েছে।
রাজনৈতিক পাল্টা-পাল্টি ও তৎকালীন প্রেক্ষাপট
সেই সময় লুৎফুজ্জামান বাবর অত্যন্ত কৌশলী বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই অস্ত্রগুলো দেশের অভ্যন্তরে নাশকতার জন্য আনা হয়েছিল। তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নাম সরাসরি না নিলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, সরকারের পতন ঘটানোর ষড়যন্ত্রেরই অংশ ছিল এই অস্ত্র। অন্যদিকে, তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা এই ঘটনার পেছনে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি তুলেছিলেন।
ভারতের নজর ও বাবরের অবস্থান
পর্যবেক্ষকদের মতে, লুৎফুজ্জামান বাবর ভারতের কাছে কেবল একজন মন্ত্রী ছিলেন না, বরং এক রহস্যময়ী চরিত্র ছিলেন। ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাবরের আমলেই বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে ভারতীয় বিদ্রোহীদের সবচেয়ে বড় চালানগুলো পারাপার হতো। ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের বিষয়টি সেই কৌশলের একটি বড় অংশ মাত্র যা হাতেনাতে ধরা পড়ে গিয়েছিল।
রাজনীতিতে এই অধ্যায়টি যেমন বাবরের প্রভাবকে তুঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল, তেমনি তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে এটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্যতম বড় সংকট। তবে দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ও ভূ-রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করলে বাবর এবং ১০ ট্রাক অস্ত্রের ঘটনাটি আজও এক অমীমাংসিত রোমাঞ্চকর গল্পের মতোই রয়ে গেছে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: আহমেদ হোসাইন ছানু। সাহিত্য সম্পাদক: মোঃ রহমত আলী। সম্পাদকীয় কার্যালয়: বিপিএল ভবন মতিঝিল ঢাকা- ১০০০। মোবাইল: 01715-90722
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫