ব্যুরো প্রধান খুলনা:
অবৈধ দোকানঘর ও ভবন নির্মাণে সংকুচিত পানি প্রবাহ, হুমকিতে কৃষি ও পরিবেশ,খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার অধিকাংশ নদী ও খাল বর্তমানে দখল, দূষণ ও ভরাটের কবলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে কচুরিপানা জমে থাকা, অবৈধ দখল এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে খালগুলোর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে কৃষি ও পরিবেশের উপর নেমে আসছে চরম বিপর্যয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় থাকা সরকারি রেকর্ডভুক্ত খাল ও জলাশয়ের অনেকাংশই প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে। কোথাও খাল ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে দোকানঘর ও পাকা ভবন, আবার কোথাও প্লট ব্যবসার নামে সরকারি খালের উপর রাস্তা নির্মাণ করে পানি চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বটিয়াঘাটায় বিভিন্ন নামে ৮২টিরও বেশি খাল ও জলাশয় রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০টি খাল ইজারা দেওয়া হলেও বাকি ৩২টি সরকারি রেকর্ডভুক্ত খাল ও জলাশয় দখল হয়ে যাচ্ছে অবৈধ প্লট ব্যবসা ও প্রভাবশালীদের কবলে। এতে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
বিশেষ করে বটিয়াঘাটা সদর হেতালবুনিয়া খালের দু’পাশ ভরাট করে প্রশাসনের চোখের সামনেই গড়ে উঠেছে শত শত দোকানঘর ও বহুতল ভবন। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে খালের উপর আড়াআড়িভাবে বাঁধ, টোনাজাল, নেটজাল, পাটাজাল, চাকজাল ও পাটাতন নেট বসিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে। এতে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে, ছোট ছোট খালগুলো দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে বসতবাড়ি, কংক্রিটের স্থাপনা ও পাকা প্রাচীর। জলমা ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর মৌজায় ১৮টি সরকারি ভরাট খাল দখল করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কিছু প্লট ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। এসব খাল উদ্ধারে স্থানীয় সচেতন মহল হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করলেও প্রশাসনিক অসহযোগিতার কারণে এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
খালগুলোতে বছরের পর বছর কচুরিপানা জমে থাকায় কোথাও কোথাও পুরো খালজুড়ে সবুজ আবরণ সৃষ্টি হয়েছে। পানির অস্তিত্বই চোখে পড়ে না। পচা কচুরিপানা থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে, বাড়ছে মশা-মাছির উপদ্রব। দূষিত পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
এছাড়া সদর হাটবাটি বাজারের ময়লা-আবর্জনা খালে ফেলার কারণে খালের গভীরতা কমে গেছে। বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে ব্যাপক জলাবদ্ধতা। আবার শুকনো মৌসুমে খালে পানি ধারণক্ষমতা না থাকায় সেচ সংকটে ব্যাহত হচ্ছে বোরো ও রবি শস্যের চাষাবাদ।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ইরি ধান, তরমুজসহ বিভিন্ন ফসলের জমিতে সেচ সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে খালে মাছ ধরা ও নৌপথে মালামাল পরিবহনের ঐতিহ্যও হারিয়ে যাচ্ছে।
হেতালবুনিয়া খাল, বয়ারভাঙ্গা খাল, হোগলবুনিয়া খাল, আমতলা খাল, বাদামতলা খাল, ইনেদার খাল, ঠাকুনবাড়ীর খাল, সমুদ্রের খাল, গোগের খাল, রামদিয়া খাল, হোগলাডাঙ্গা খাল ও বাঁশবাড়িয়া খালসহ অধিকাংশ সরকারি খাস খালের পানি প্রবাহ বর্তমানে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
জাতীয় কৃষক সমিতির খুলনা জেলা কমিটির সভাপতি গৌরাঙ্গ প্রসাদ রায় বলেন, “নদী ও খাল রক্ষার দায়িত্ব যাদের, তারা দেখেও না দেখার ভান করছেন। নদী-খাল সংরক্ষণ আইন থাকলেও তার সঠিক প্রয়োগ না থাকায় দখল ও দূষণ দিন দিন বাড়ছে। এতে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও কৃষি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।”
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী গোপাল কুমার দত্ত বলেন, “এখনও পর্যন্ত জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে কচুরিপানার সমস্যা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শোয়েব শাত-ঈল ইভান জানান, “আমি যোগদানের পর থেকে বেশ কিছু সরকারি রেকর্ডভুক্ত খাল অবৈধ দখলমুক্ত করে টেন্ডারের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হয়েছে। বাকি খালগুলোও সার্ভেয়ারের মাধ্যমে চিহ্নিত করে সীমানা পিলার স্থাপনপূর্বক দখলমুক্ত করা হবে।”
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থান্দার কামরুজ্জামান বলেন, “সব সরকারি রেকর্ডভুক্ত খাল দখলমুক্ত করে পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই খনন কাজ শুরু হবে।”
সচেতন মহলের দাবি, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, কচুরিপানা অপসারণ এবং দ্রুত খাল খনন কার্যক্রম শুরু না হলে ভবিষ্যতে বটিয়াঘাটার কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবনে নেমে আসতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: আহমেদ হোসাইন ছানু। সাহিত্য সম্পাদক: মোঃ রহমত আলী। সম্পাদকীয় কার্যালয়: বিপিএল ভবন মতিঝিল ঢাকা- ১০০০। মোবাইল: 01715-90722
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫