কলি বেগম,জগন্নাথপুর
প্রকৃতিসহ নানামুখি দুর্ভোগ ও সমস্যার বেড়াজালে ভালো নেই জগন্নাথপুর উপজেলার কৃষকেরা। কৃষক হৃদয়ের ক্রন্দন দেখার যেন কেউ নেই। আর জমি আবাদ করবো না বলে তওবা করছেন অনেক কৃষক। কতটা কষ্ট পেলে মানুষ তওবা করতে পারে, তা জানা বা বুঝার কেউ নেই।
গত সপ্তাহ থেকে জগন্নাথপুরে বোরো ধান কর্তন শুরু হয়েছে। হাওরজুড়ে রীতিমতো ধান উৎসব চলছে। কৃষক-কৃষাণীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মাঠে। ধান কর্তন নিয়ে হাওরে প্রতিযোগিতা চলছে। তবে নানামুখি সমস্যা ও ধানের কাঙ্খিত দাম না থাকায় কৃষক মনে কষ্টের শেষ নেই। ফলে ধান কর্তনের টাকাও জোগার করতে পারছেন না অনেক কৃষক। ধানের দাম কম থাকায় ধানুয়া অগ্নিতে কেউ টাকাও দিচ্ছে না।
জগন্নাথপুরে বৈশাখের শুরুতেই উপজেলার সব চেয়ে বড় নলুয়ার হাওরসহ কয়েকটি হাওরের নিচু জমি বৃষ্টির পানিতে ডুবে যায়। এর মধ্যে কিছু আধাপাকা ধান ও কিছু থোড় ধান ছিল। জমির পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় থোড় ধানগুলো পচে নষ্ট হয়ে যায়। তবে আধাপাকা ধানগুলো ঘরে তুলতে শুরু হয় কৃষিযুদ্ধ। বর্তমানে প্রায় প্রতিদিন দিনে অথবা রাতে ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশের চোঁখ রাঙানি দেখলে জমিতে পাকা রেখে রাতে ঘুম আসেনা কৃষকদের। প্রতিদিনের বৃষ্টিতে আরো বাড়ছে জলাবদ্ধতা। নতুন করে আরো জমি ডুবে যাচ্ছে। তবে এখন ডুবছে পাকাধান। এখন ডুবে যাওয়া ধান হারভেস্টার মেশিন কাটে না। তারা অল্প পানিতে ধান কাটতে পারে। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে জগন্নাথপুর উপজেলায় এ পর্যন্ত ৭৫টি হারভেস্টারার মেশিন নেমেছে। বাস্তবে অনেক কম বলে কৃষকদের দাবি।
এদিকে-পানিতে নেমে কেউ ধান কাটতে চায় না। ফলে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। বাড়তি টাকা দিয়ে অনেকে ধান কাটাচ্ছেন। জনপ্রতি ৮ থেকে ৯শ টাকা রোজে ধান কাটানো হচ্ছে। এতোদিন হারভেস্টার মেশিন ২ হাজার টাকা কেদারে ধান কাটছিল। নতুন করে জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন ২৫০০ টাকা কেদার ধরে ধান কাটছে। এর মধ্যে ১৯ এপ্রিল থেকে ২০ এপ্রিল বিকেল পর্যন্ত জগন্নাথপুরে জ্বালানী তেল ছিল না। ফলে অধিকাংশ হারভেস্টার মেশিন ধান কাটতে পারেনি। তবে ২০ এপ্রিল বিকেলে তেল আসায় পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। যদিও নতুন বর্ধিত মূল্যে তেল কিনতে হয়েছে সবাইকে। এ জন্য কেদার প্রতি ৫০০ টাকা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তবে ধানের দাম না থাকায় কৃষকেরা বিপাকে পড়েছেন।
২০ এপ্রিল সোমবার সরেজমিনে নলুয়ার হাওরে কথা হয় কৃষক রাশিদ উল্লাহ, আলীনুর, চুনু মিয়াসহ অনেকের সাথে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এমন হবে আগে জানলে জমি আবাদ করতাম না। পানিতে থাকা জমির ধান কাটানোর মানুষ পাচ্ছি না। চোঁখের সামনে জমির পাকাধান বৃষ্টির পানিতে ডুবে যাচ্ছে। দেখেও কিছু করতে পারছি না। জমিতে পানি থাকায় এখানে হারভেস্টার মেশিনও আসছে না। ভাগ্যক্রমে মানুষ পেলে ৮ থেকে ৯শ টাকা রোজ দিতে হচ্ছে। হাওরের উপরে থাকা অল্প পানিতে মেশিন ধান কাটলেও এখন তারা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এতোদিন ছিল ২ হাজার টাকা কেদার। আজ থেকে বেড়ে ২৫০০ টাকা হয়ে গেছে। তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের খরচ বেড়েছে। এতোকিছুর পরও যখন দেখি ধানের দাম নেই, তখন খুব কষ্ট পাই। ধান বিক্রি করতে চাইলে প্রথমে কেউ কিনতে চায় না। অনেক চেষ্টা করে অবশেষে মিল সহ কেউ কেউ কিনতে আগ্রহী হলেও দাম অনেক কম। মাড়াই করা কাঁচাধান প্রতিমণ ৫০০ টাকা ও শুকনো ধান সর্বোচ্চ ৮শ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। যা গত বছর কাঁচাধান ৯শ ও শুকনো ধান ১২শ টাকা দামে বিক্রি হয়েছিল। এবার ধান উৎপাদন খরচ বাড়লেও নেই ধানের দাম। ফলে ধান পেলেও খুশি হতে পারছি না।
জগন্নাথপুর বাজারের মেসার্স একতা মিলের মালিক আমির আলী জানান, আমরা কাঁচাধান কিনি না। শুকনো ধান ভালো হলে সর্বোচ্চ ৮শ টাকা মণ দরে কেনা হচ্ছে। জ্বালানী তেলের দোকান মেসার্স নাঈম ট্রেডাসের মালিক তাজুল ইসলাম বলেন, গতকাল কোন তেল ছিল না। আজ বিকেলে তেল এসে বিক্রিও হয়ে গেছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নতুন বর্র্ধিমূল্যে বিক্রি করা হয়েছে। জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ জানান, জগন্নাথপুরে এবার ২০ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। সরকারি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লক্ষ ২৮ হাজার ৫১০ মেট্রিকটন ধান। এ পর্যন্ত ২০ ভাগ ধান কর্তন হয়েছে। আশা করছি, আগামী ২ সপ্তাহের মধ্যেই বাকি ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গতকাল থেকে জ্বালানী তেলের সংকটে অনেকটা হারভেস্টার বন্ধ ছিল সত্যি তবে আজ থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় ৯ হাজার লিটার ডিজেল সংগ্রহ করায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। তিনি আরো জানান, এবার ধানের ফলন খারাপ হয়নি। তবে কাঙ্খিত মূল্য পাচ্ছেন না কৃষকেরা। জগন্নাথপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো.শাহাব উদ্দিন ও জগন্নাথপুর সদর খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা শিবু ভূষন পাল জানান, সরকারিভাবে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ এখনো শুরু হয়নি। সরকারি নির্ধারিত মূল্য এখনো জানানো হয়নি।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: আহমেদ হোসাইন ছানু। সাহিত্য সম্পাদক: মোঃ রহমত আলী। সম্পাদকীয় কার্যালয়: বিপিএল ভবন মতিঝিল ঢাকা- ১০০০। মোবাইল: 01715-90722
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫