লেখকঃ মো. রিমেল
বাজিতপুরে ভোরের স্নিগ্ধ বাতাস প্রবাহমান। জলাশয়, পুকুর আর বর্ষার পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধানক্ষেতে ফুটেছে সাদা শাপলা। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি মনের উন্মাদনাকে বাড়িয়ে দেয়। আঁকাবাঁকা গ্রামীণ পথে ঘণ্টাখানেক চলার পরে জড়ো হাওয়ার শুরু হয়। দক্ষিণ দিকের জলরাশি জানান দেয়—এটা নিকলী হাওর। মেঘলা আকাশে লুকোচুরি খেলায় মাতে সূর্য। সূর্যের আলোয় হাওরের মাঝখানে রুপালি চাদর কিছুক্ষণ থেকে আবার মিলিয়ে যায়। হাওরের বেরিবাঁধের কিনারে কিছুটা সবুজ প্রান্তর চোখে ধরা পড়ে। জায়গাটা খানিকটা উঁচু হওয়ায় বর্ষার পানি গ্রাস করতে পারেনি। হয়তো আর এক-দুই দিনের বৃষ্টিপাত হলে হাওর নিজের পরিপূর্ণ চেহারা খুঁজে পাবে।
সবুজ প্রান্তরের পূর্বদিকে একটা টিনের ঘর টিকে আছে। তার পাশে ঘাস খায় গরুর পাল। এলাকার এক জোয়ান ছেলেটি হাঁসগুলোকে বেরিবাঁধের উপর থেকে ছেড়ে দিল। সবুজ প্রান্তর পেরিয়ে তারা আনন্দে ডানা ঝাপটাতে শুরু করে—যেন উড়ে যেতে চায় পাখির মতো অজানা দিগন্তে। সবুজ প্রান্তরের শেষে, যেখান থেকে পানি শুরু হয়েছে, সেখানে একটি ডিঙি নৌকা দেখা যায়। নৌকায় কচুরিপানা তুলছে এক বৃদ্ধ লোক। সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পানির দিকে তাকিয়ে, বেরিবাঁধ ঘেঁষে মেঘলা আকাশে উড়ে চিল। উঁচু ঢিপিতে বসে থাকা লোকগুলোর দৃষ্টি আটকে যায় চিলের উপর। চিল যেন নিজে কোনো শক্তি দিয়ে উড়ছে না—স্থির হয়ে আছে।
গানের আওয়াজ ভেসে আসে নিকলী হাওরের পূর্বদিক হতে। রাস্তার উত্তরে বিয়ের গেইট আছে দুটি। তবে গানের আওয়াজ বিয়েবাড়ি থেকে নয়—হাওরে থাকা দুটি নৌকা থেকে আসছে। নৌকায় লোকেরা গানের তালে আনন্দে মেতে উঠেছে। চা দোকানের লোকেরা আর গ্রামের তিন-চারজন নারী নৌকাগুলো দেখতে আসে—বরপক্ষ এসেছে কিনা তা দেখতে। লোকের বহর দেখে মনে হয় তারাই বিয়ের বরপক্ষের যাত্রী। কিন্তু আসলে তারা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ হতে এসেছে নিকলী হাওর ভ্রমণে। সবাই অপেক্ষায় আছে, কখন নৌকা ছাড়বে। উদ্দেশ্য ছিল ছাতির চর।
হাওরের সৌন্দর্য, প্রকৃতি ও জলরাশি দেখে মনে হয়—সত্যিই এবারের ভ্রমণের স্লোগানটি সার্থক হয়েছে:
আকাশের কোলে, হাওরের জলে
এই আছি বেশ, প্রাণখোলে…
বিরক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে যাওয়ার পূর্বে রাস্তায় অপূর্ব এক দৃশ্যের উদয় হয়। সারিবদ্ধ বেদে মেয়ের দল যাচ্ছে পানি তুলতে। হলুদ সারিতে প্রতিটি মেয়ের হাতে কলসি। সবার সামনে নেতৃত্ব দিচ্ছে ছোট্ট একটি মেয়ে। পানি নিয়ে একই পথে ফিরে আসে তারা। একটি পাগল ছেলে অজানা সুখে নাচতে শুরু করে নৌকা দুইটির সামনে।
প্রথম নৌকায় ছিলেন শিক্ষকগণ ও কিছু শিক্ষার্থী। দ্বিতীয় নৌকায় ছিলেন বাকি শিক্ষার্থীরা। সেই নৌকার সামনে একজন লোক আমড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উচ্চ স্বরে বলে—
“আমড়া লাগবে? আমড়া… আমড়া…”
নৌকা থেকে শ্রাবণ ডাকে—
“এদিকে আসেন।”
লোকটাকে দেখে মায়া লাগে শ্রাবণের। সকালে বাংলা বিভাগের বুক করা নৌকাগুলো ছাড়া আর তেমন নৌকায় লোক ছিল না। অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ বিক্রি শুরু হয়নি। যাই হোক, শ্রাবণ জিজ্ঞেস করে—
“আমড়া কত করে?”
“১০ টাকা পিস।”
যদিও শ্রাবণের নিজের খাওয়ার ইচ্ছা ছিল না, তবুও সে ৪–৫টা আমড়া কিনে নেয় এবং আমড়াগুলো নৌকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভাগ করে দেয়।
একটু পরে ৮–৯ বছরের একটি মেয়ে ভুট্টা ভাজা ও বাদাম নিয়ে আসে। চেহারা দেখে যে কেউ মেয়েটির মায়ায় পড়বে। স্কুল ড্রেস পরে এসেছিল সে। কাছে গিয়ে সবাইকে জিজ্ঞেস করছে—
“বাদাম নিবেন?”
হামিদ বলে—
“তোমার নাম কী?”
“বকুল।”
“কত টাকার বিক্রি করেছো?”
“এখন সকাল। শুরু করেছি।”
“নেন না বাদাম!”
“বকুল, বাদাম না নিলে তুমি কী করবে?”
“আপনি এখন খান, পরে টাকা দিয়েন। আমি এখানে আছি…”
“তুমি বেশ মিষ্টি মেয়ে তো…”
আসলে মেয়েটি এমনভাবে বলছিল যে, যার কাছে টাকা থাকত, সে তার সরলতা ও কথার জাদুতে কিনতেই বাধ্য হতো। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে তখন টাকা ছিল না।
বাংলা বিভাগের রাকিব ভাই বলেন—
“এক প্যাকেট বাদাম দাও তো।”
তিনি একজনকে বলেন, নৌকার সবার মধ্যে ভাগ করে দিতে। মেয়েটির সঙ্গে কিছুটা খুনসুটিতেও মেতে ওঠেন রাকিব ভাই।
নৌকার ভিড় থেকে বায়েজিদ এসে বলে—
“এই ছোট্ট পরি, কী বিক্রি করো?”
“বাদাম।”
“দাও আমাকে এক প্যাকেট।”
বায়েজিদ মাথায় হাত বুলিয়ে মেয়েটিকে একটু আদর করে।
মেয়েটির হাত থেকে বাদাম ও ভুট্টা ভাজার প্যাকেটগুলো কেউ নিয়ে যায়। পিছনে ফিরে দেখে, কারও হাতে নেই তার বাদাম বা ভুট্টা ভাজার প্যাকেট। হঠাৎ একজন তার হাত ধরে বলে—
“এসো, তোমার গুলো আমি বিক্রি করে দিচ্ছি।”
“ভুট্টা ভাজা… ভুট্টা ভাজা…”
এভাবে মেয়েটির হাতে কিছু টাকা তুলে দেয় একজন।
“ভালো থেকো বকুল।”
“ভাইয়া, আপনারা আবার আসবেন না ঘুরে?”
“হ্যাঁ, আসবো।”
প্রকৃতপক্ষে, মেয়েটি ছিল আমড়া বিক্রেতার পরিবারের একজন সদস্য। লোকটির মনে হয়েছিল, যেহেতু আমড়া বিক্রি হয়েছে, তাহলে বাদাম ও ভুট্টা ভাজাও বিক্রি হবে। তাই সে মেয়েটিকে বিক্রির জন্য পাঠিয়েছিল। এভাবে লোকটি ও মেয়েটি মিলে দুটি নৌকা থেকে ৪০০–৫০০ টাকার মতো বিক্রি করে, যা অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক ভালো ছিল।
এদিকে, নৌকার ইঞ্জিন চালু হয়েছে। রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির অন্তর কেঁপে ওঠে। এতো নৌকা হাওরে আসে-যায়, তবে এই দুইটি নৌকা চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মন উতলা হয়ে ওঠে। মেয়েটি নিজেও জানে না—কেন এমনটা হচ্ছে। টাকা নয়—কোনো এক অজানা আকর্ষণ ঘিরে থাকে সমস্ত ইন্দ্রিয় জুড়ে। নৌকাগুলোর ফেরার অপেক্ষায় থাকে সে।
বিকেল হয়ে যায়। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। চা দোকানের সামনে বৃষ্টির ফোঁটা থেকে বাঁচতে একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে বকুল। মনে ভাসছে একটা কথা—
“ভালো থেকো বকুল…”
দূরে দুটি নৌকা দেখা যাচ্ছে। কাছে আসতেই এগিয়ে গেল বকুল। কিন্তু এগুলো সেই নৌকাগুলো নয়। পরের দিনের আশায় ঘরে ফিরে যায় সে।
লেখক পরিচিতি:
মো. রিমেল, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী। গল্প, কবিতা, ফিচার ইত্যাদি লেখেন। বর্তমানে বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অর্থসম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দৈনিক সমকাল, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ম্যাগাজিনে ২৭টিরও অধিক লেখা প্রকাশিত হয়েছে।