কলমেঃ মানিক পাল
একুশের ওই সকালডা
আমার মাথা থেইকা আর নামে না।
ফজর পড়া শেষ কইরা দেখি
পোলার চোখডা কেমন জ্বলতেছে।
চুপচাপ ভাত খাইতেছিল,
কিন্তু বুঝতেছি ভিতরে আগুন জ্বলতেছে।
আমি কইলাম–
“যাইস না বাপ… আজ যাইস না।”
ও হালকা হাসি দিয়া কইল,
“মা, ভাষার লাইগা যাইতেছি।”
আমি আর ধইরা রাখি নাই।
মা হইলেও সব সময় ধইরা রাখা যায় না।
দুপুর গড়াইতে না গড়াইতেই
বাইরে হইচই বাড়তে লাগল।
কেউ দৌড়ায়, কেউ চিল্লায়–
আমার বুক ধকধক করতেছিল।
একজন দৌড়ায়া আইসা কইল,
“খালা… গুলি চলতেছে।”
আমার কানে আর কিছু ঢোকে নাই।
পা কাঁপতেছিল, তবু রাস্তায় গেছি।
মানুষের ভিড়ের মইধ্যে
আমার পোলাডারে পাইছি।
রাস্তার ধুলায় সে পইড়া আছিল–
মুখডা শান্ত… যেন ঘুমাইতেছে।
বুকের কাছে রক্ত শুকায়া গাঢ় হইয়া গেছে।
আমি চিল্লাই নাই।
গলার স্বর বাইর হয় নাই।
মনে হইতেছিল– বুকের ভিতর পাথর চাপা।
মানুষ কইল শহীদ।
আমি শুধু কইলাম,
“এইডা আমার পোলা…
আমার বাপ।”
এহন একুশ আইলে
মানুষ ফুল দেয়, ভাষায় কথা কয়।
আমি ভিড়ের মইধ্যে দাঁড়াইতে পারি না–
ঘরে বসা থাকি।
চুপচাপ কই–
ভাষা যদি বাঁচে,
তাইলে আমার পোলাডারে
ভুইলা যাইও না।
আমি জোরে কাঁদি না।
আমার কান্নাডা চাপা।
বুকের ভিতর থাইকা যায়।
আর থামে না।
(পুরান ঢাকার এক মায়ের জবানিতে “একুশের স্মৃতি”)