নিজস্ব প্রতিবেদক
আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি যেখানে শুদ্ধ বানান বা ঝরঝরে ভাষাই এখন লেখকের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি যদি খুব সুন্দর করে গুছিয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন, তবে চারপাশের মানুষ সন্দেহী চোখে তাকিয়ে ভাববে—এটি কি চ্যাটবটের কাজ? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) এই জোয়ারে নিজের লেখাকে ‘মানুষের তৈরি’ হিসেবে প্রমাণ করাই এখন বিশ্বজুড়ে পেশাদার লেখকদের কাছে এক বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিজেকে রোবট নয় বরং রক্ত-মাংসের মানুষ প্রমাণ করতে অনেক লেখক এখন লেখায় ইচ্ছা করে ভুল করছেন কিংবা অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহার করছেন।
নিখুঁত লেখাই যখন শত্রু
এআই বা চ্যাটবটগুলো মানুষের লেখা কোটি কোটি নিবন্ধ পড়ে এমন এক মসৃণ লেখার ধরন রপ্ত করেছে, যা প্রায় নিখুঁত। আর এই অতিরিক্ত নিখুঁত হওয়াই এখন সন্দেহের কারণ। নিউইয়র্কের কপিরাইটার সারাহ সুজুকির মতো অনেকেই এখন নিজের লেখার চিরচেনা আভিজাত্য বিসর্জন দিচ্ছেন। তিনি জানান, নিজেকে ‘মানুষ’ প্রমাণ করতে তিনি এখন লেখায় একগাদা বিস্ময়সূচক চিহ্ন (!) ব্যবহার করেন কিংবা ইচ্ছা করেই ‘আরে ভাই’ বা ‘সত্যি বলতে’-র মতো অতি-চলিত শব্দ জুড়ে দেন। তার মতে, এটি যেন এক ‘উল্টো টিউরিং টেস্ট’—যেখানে যন্ত্রের কাছে মানুষকে প্রমাণ করতে হচ্ছে যে সে যন্ত্র নয়।
সন্দেহ বনাম সৃজনশীলতা
এই সংকটের কবলে পড়ে সম্প্রতি ফ্রান্সের একটি প্রকাশনা সংস্থা ‘শাই গার্ল’ নামক একটি বই বাজার থেকে তুলে নিয়েছে কেবল এআই ব্যবহারের সন্দেহে। অথচ লেখক বারবার দাবি করেছেন এটি তার নিজের পরিশ্রম। অনেক লেখক এখন এআই-এর খসড়া করা লেখাকে ‘মানবিক’ করতে দীর্ঘ ড্যাশ (—) চিহ্ন বাদ দিচ্ছেন, বদলে দিচ্ছেন ছোট ছোট হাইফেন। কেউ কেউ আবার বাক্যের গঠন ইচ্ছা করে কিছুটা অগোছালো রাখছেন যাতে সেটি ‘হস্তশিল্পের’ মতো মনে হয়।
সেই স্বাদের অভাব
মিশিগানের ব্লগার রায়ান জনসনের মতে, এআই দিয়ে লেখা অনেকটা স্যুপে জল মেশানোর মতো। গ্রাহক শুরুতে বুঝবে না, কিন্তু একসময় ঠিকই বুঝবে যে খাবারের সেই পুরনো স্বাদটা আর নেই। নিজের লেখার মৌলিকতা টিকিয়ে রাখতে তিনি এখন জনপ্রিয় কমেডি সিরিজের অপ্রচলিত উক্তি বা আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করছেন। তার ভয়—এআই-এর মসৃণ লেখার ধরন অনুকরণ করতে গিয়ে মানুষ কি তবে নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলছে?
আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি
দৈনিক জনকামনা-র পাতায় আমরা সব সময় বিশ্বাস করি, একটি ভুল বানান বা একটি এলোমেলো বাক্যও কখনো কখনো অনেক বেশি জীবন্ত হতে পারে যদি তার পেছনে মানুষের আবেগ থাকে। রোবট হয়তো দ্রুত লিখতে পারে, কিন্তু সে কখনো পাঠকের হৃদস্পন্দন বুঝতে পারবে না। এআই-এর এই যান্ত্রিক যুগে মানুষের হাতের ছোঁয়া থাকা লেখাই হবে আগামীর আসল ‘লাক্সারি’ বা আভিজাত্য।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: আহমেদ হোসাইন ছানু। সাহিত্য সম্পাদক: মোঃ রহমত আলী। সম্পাদকীয় কার্যালয়: বিপিএল ভবন মতিঝিল ঢাকা- ১০০০। মোবাইল: 01715-90722
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৫