স্টাফ রিপোর্টার:
আজ ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সুফি স্কলার খাজা ওসমান ফারুকীর শুভ খোশরোজ শরীফ।
আলোকবর্তিকা—আলোর প্রদীপ, যার বিপরীতে কেবল অন্ধকার। যেভাবে ভালোর বিপরীতে মন্দ, বাহিক্যতার বিপরীতে অভন্তর, প্রকাশ্যের বিপরীতে গোপন, অর্থহীনতার বিপরীতে অর্থময়তা, দুঃখ-কষ্টের বিপরীতে প্রশান্তি, উদ্বেগের বিপরীতে পরিতৃপ্তি এবং এভাবে সমস্ত বৈপরীত্য। পৃথিবীর আদি ও চিরন্তন ব্যবস্থা এই বৈপরীত্য—সভ্যতায় আলো-অন্ধকারের দ্বৈততা চিরন্তন। অন্ধকার দুঃখ-কষ্ট, উদ্বেগ, অর্থহীনতার প্রতীক। এর বিপরীতে আলোর অবস্থান, যার কল্যাণে প্রাণের অস্তিত্ব বিকাশ লাভ, যার উৎস সূর্য। সভ্যতার প্রধান পৃষ্ঠপোষক এই আলো। সমাজব্যবস্থার কল্যাণে যা উপকারী তাই আলোর পরিচায়ক। এই আলোর অবগাহক খাজা ওসমান ফারুকী।
আমরা তাঁর আলো অবগাহন করে চলেছি। তাঁর চিন্তা ও কাজ ঐশীপ্রেমের উজ্জ্বল জ্যোতি। যাঁর কণ্ঠে অবিরাম নিঃসৃত হয় প্রেম। যাঁর সংস্পর্শ অবসান ঘটায় জাগতিক দুঃখ-যাতনার। একটি পরিপূর্ণ আলোকবর্তিকা হিসাবে তিনি কাজ করে চলেছেন অক্লান্ত। তাঁর আহ্বান শুদ্ধময়তা। আত্মশুদ্ধি। বহু বছরের বহু সাধনার ফলে যার প্রাপ্তিলাভ ঘটে। এটি অর্জনের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়-অভ্যন্তর ও আত্মার মাঝে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। হৃদয়ের গহিনে জাগে এক গভীর অন্তর্দৃষ্টির। পৃথিবী প্রাচীন ও মৌলিক এ তত্ত্বের প্রবক্তা সুফিসাধকগণ মনে করেন, আত্মশুদ্ধি চর্চা পরমজ্ঞান লাভের মাধ্যম। মানবমনের স্বাভাবিক শক্তিবলে নয়, এক ধরনের প্রগাঢ় অন্তর্দৃষ্টি এবং অতীন্দ্রিয় অনুভবশক্তির সাহায্যেই কেবল পরাতাত্ত্বিক ও পারমার্থিক ঐশী জ্ঞানের সন্ধান লাভ সম্ভব। খাজা’জী সেই জ্ঞানের পথের অগ্রযাত্রী। পরমসত্তালাভ এবং মহান রবের একাত্মলাভে তিনি আমাদের পথপ্রদর্শক।
আজকালের এই অস্থির ও টালমাটাল সময়ে গভীর অন্ধকার সমুদ্রে আলোর সন্ধান কূলকিনারাহীন। কেবল অন্ধকার—এই অন্ধকারে খাজা ফারুকী এক আলোর তরী, এক আলোর অভিযাত্রী। উৎসর্গপ্রাণ, আত্মপ্রত্যয়ী, আদ্যোপান্ত নিরহংকারী এক প্রেমিক তিনি। নৈকট্যপ্রাপ্ত সৌভাগ্য লাভকারী আমরা যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছি, তারা উপলব্ধি করি তাঁর সীমাহীন ত্যাগ, যদিও তিনি খুবই সাধারণ কিন্তু গভীর অর্থপূর্ণ জীবন তাঁর। আপসহীন মনোভাবে তাঁর জীবন বয়ে চলেছে মানকল্যাণে। সুফিসাধকদের উত্তরাধিকার তিনি। তাঁর সম্মোহনী চারিত্র্য-মাধুর্যে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। একবিংশ শতাব্দীর অস্থির-উন্মত্ত পৃথিবীর ভোগসর্বস্ব সমাজব্যবস্থা নিঃশেষ করে নিয়েছে আত্মার সমস্ত লাবণ্য। মানুষ হয়ে উঠছে নীরস, শুষ্ক-নির্জীব এক প্রাণসত্তা। বিপর্যস্ত মানবকূল। মানবিক বিপর্যয় সর্বত্র! সংকটময় এই সময়ে একজন খাজা ফারুকী নিবিষ্টচিত্তে মানবমুক্তির জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। মানবকল্যাণে তাঁর মহান ব্রত প্রেমের আহবানে। হতাশাগ্রস্ত এই সময়ে অসংখ্য মানুষ তাঁর নিকট আস্থা খুঁজে পান, লাভ করেন প্রশান্তি।
সর্বগ্রাসী পণ্যদাসত্ব থেকে সচেতন মুক্তির পথ নির্মাণের মাধ্যমে তিনি মানুষের হৃদয় অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠা করেন অত্যন্ত উঁচু ও গভীর মূল্যবোধ। এই বিশ্বাসের শক্তিতে তিনি নিজে গভীরভাবে উজ্জীবিত এবং অন্যদের মাঝে তা সঞ্চারে প্রয়াসী। তিনি বলেন, ‘হৃদয়ের ধর্ম হলো নীরবতা, তাতে অন্তরের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যায়। আর এটিই নিজেকে আবিষ্কারের পথ।
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মানুষকে আত্মোন্বেষণের দিশা দেখাতে তিনি সুফি মেডিটেশন নিয়ে কাজ করে চলেছেন। অস্থিরতা, উদ্বেগ ও দেহমনের নৈরাজ্য নিরসনে সুফি দর্শনের আলোকবর্তিকা নিয়ে খাজা ফারুকীর যাত্রা সুদীর্ঘ। তিনি মেডিটেশন মাস্টার হিসাবে ক্লাস নিয়ে চলেছেন এবং মুরাকাবা ও মেডিটেশনের ওপর লিখেছেন বাংলা ভাষায় এক পাঠকনন্দিত বই— সুফি মেডিটেশন।
খাজাজী হযরত মনে করেন, মানবপ্রকৃতির সাধারণ বৈশিষ্ট্য প্রজাপতির ন্যায় আলোর দিকে ধাবিত হওয়া এবং অঙ্গার হওয়া। এ এক গভীর বিভ্রম— ভোগসর্বস্ব সমাজব্যবস্থা সামষ্টিক যে প্রতিযোগিতার দিকে আমাদেরকে ঠেলে দেয়, তার শেষ প্রান্তে পৌঁছে দেখা যায় কিছু নেই সেখানে। একদিকে জীবনের অর্থহীনতা, আরেকদিকে বাহ্যিক শত সাফল্যের পরেও তৃপ্তি না পাওয়া— মানব দ্বৈতসত্তার প্রকৃত মুক্তি আসলে বাইরে নয়, অন্তরে। তাকে তাকাতে হবে মনের আয়নায়, যেখানে প্রতিফলিত হচ্ছে আত্মার সেই স্বরূপ, যা আবিষ্কারের পর মানুষের মন স্থির হয়, শান্ত হয়। তখন বাহ্যিকতা নয়, অভ্যন্তরের উৎসই তাকে প্রশান্তির স্রোতে ভাসিয়ে নেয়। পার্থিবতার যাঁতাকলে পিষ্ট উদ্বিগ্ন মানুষের আজ দরকার সেই দিশা, যা তাকে নিজের পরিচয়ের স্বরূপ উন্মোচন করে। আর এই স্বরূপ সন্ধানের যে পথপদ্ধতি তা নির্দেশ করে সুফি দর্শন ও মেডিটেশন। খাজা ফারুকীর বহুল প্রসিদ্ধ গ্রন্থ সুফি মেডিটেশন সেই দিশারী।
ভোগ, দখল আর লুটে নেওয়া সমাজপাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে খাজা ফারুকী ত্যাগ ও প্রদানের এক অনন্য উদাহরণ। নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত সমাজকে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বলে বলিয়ান করে আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে এক অনন্য দৃষ্টান্ত তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সুফি স্পিরিচুয়াল ফাউন্ডেশন সামাজিক-উন্নয়নমূলক বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করে চলেছে। প্রবহমান এ আলোর বিকিরণে আলোকিত হচ্ছেন বহু মানুষ। জীবনের নানামুখী সংকটের মুখোমুখি যন্ত্রণাকাতর মানুষকে শেফা প্রদানে, অনিশ্চিতের সামনে জীবনের প্রকৃত সত্য উপলব্ধিতে সুলুকের সন্ধান দানে তিনি উদ্ভাবন করেছেন সুফি মেডিটেশন মেথড। সাধারণ মানুষের জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে আত্মশুদ্ধির মেথড এটি।
সর্বজনীন চিন্তাবিদ এবং অসাম্প্রদায়িক খাজা ফারুকীর দর্শন মানবজীবনের পরস্পরবিমুখ ধারণাকে সমতার পথে সাক্ষাৎ করায় এবং বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির ভিতর মেলবন্ধন ঘটায়। যেন এক হিপনোটিক শক্তি দিয়ে তিনি বিমোহিত করেন ভালোবাসায়, প্রেমে। মানবজীবনের চারপাশে বেষ্টিত থাকা এ ব্যস্ততা কি কোলাহল নাকি তাড়াহুড়ো? তিনি তার উত্তর প্রদান করেন প্রেমের ডানায় ভর করে।
যে রহস্য মানুষ সন্ধান করছে, তার অবস্থান নিজের অন্তরেই। হৃদয়ের ভাঙন মেরামতে, হৃদয়ের গহীন পরিচ্ছন্ন করতে দরকার আত্মার আলো জ্বালানো। খাজাজী হযরত এর সদ্য প্রকাশিত “আত্মার নকশা” -মানব চেতনার রহস্যময় মানচিত্র’ গ্রন্থটি সেই চেরাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মানবজীবনের অন্ধকারের গলির মুখে। তাঁর আরেকটি সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘আত্মার বিজ্ঞান: আল-কুরআনের আলোকে দর্শন-ধ্যান ও আধ্যাত্মিকতা’ এমন এক কিতাব— যতই এর গভীরে পাঠক অভিযাত্রা করেন, চেতনার একটি অন্তর্নিহিত শক্তির সম্মুখে উদ্ভাসিত হয় সত্যের স্বরূপ। এটি সেই সত্য, যেখানে মানুষ নিজের পরিচয় খুঁজে পায়। ভাঙা হৃদয়ের প্রলেপে এখানে সন্ধান পায় চিরন্তন আত্মার। বাহ্যিকতা থেকে মানুষ তখন হয় অভ্যন্তরমুখী। অশান্ত হৃদয় শান্ত হয়। সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়। আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা ভিতরে জাগিয়ে তোলে অর্থবোধ, ভালোবাসা এবং শান্তি। সুফিদর্শনের জীবনদায়ী এই অনন্ত বার্তা মনোবিজ্ঞানকে সঙ্গে নিয়ে মানুষের আত্মার গভীরতায় প্রবেশের পথ নির্মাণ করেন খাজাজী। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাথে সুফিতাত্ত্বিক এই চিকিৎসা আত্মশুদ্ধির নতুন পথ তৈরি করে আমাদের সামনে— খাজা ফারুকী সেই পথনির্দেশক।
আজ ৯ই সেপ্টেম্বর— ভালোবাসা, শান্তি ও আধ্যাত্মিক জাগরণে নিরলস আহ্বান করে চলা খাজা ওসমান ফারুকীর জন্মদিন। খাজাজী সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্যও নিরন্তর ছুটে চলেন। আমি তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং সফলতা কামনা করছি। অসীম সাহসিকতার সাথে আলো ও ভালোর সাথে থাকার মতো আপনি নিজেও ভালো থাকুন। আলো বিকিরণ ছড়ানো সুদীর্ঘ হোক। পথহারাদের পথ দেখানো অব্যাহত থাকুক।
লেখক: প্রফেসর ড. মো. ওসমান গনী, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।